শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

যুক্তরাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যায় বড় পরিবর্তন: তরুণদের দাপট বাড়ছে

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৫, ২০২৬, ০৯:৪৪ পিএম

যুক্তরাজ্যের মুসলিম জনসংখ্যায় বড় পরিবর্তন: তরুণদের দাপট বাড়ছে

Ai - ছ

যুক্তরাজ্যের রাজনীতির ভবিষ্যৎ রণক্ষেত্রটি হয়তো এমন এক তরুণ মুসলিম প্রজন্মের হাত ধরে নির্ধারিত হতে যাচ্ছে, যারা ওয়েস্টমিনস্টারের ভাবনার চেয়েও দ্রুত গতিতে বড় হচ্ছে। মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি) প্রকাশিত ‘ব্রিটিশ মুসলিমস ইন নাম্বারস’ শীর্ষক এক নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের মোট জনসংখ্যার ৬ দশমিক ৫ শতাংশই এখন মুসলিম। এই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের বয়স। ব্রিটিশ মুসলমানদের গড় বয়স মাত্র ২৭ বছর, যা দেশটির জাতীয় গড় বয়সের চেয়ে ১৩ বছর কম।

ব্রিটিশ মুসলিমদের প্রায় অর্ধেকই এখন ২৫ বছরের কম বয়সী।

এই জনমিতিক পরিবর্তন যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভোটারদের বয়স কমিয়ে ১৬ বছরে আনার যে প্রস্তাবটি এখন পার্লামেন্টে আলোচিত হচ্ছে, তা পাস হলে আরও অন্তত দেড় লাখ মুসলিম তরুণ ভোটাধিকার পাবেন। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের স্বাস্থ্য নীতি বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক মিকদাদ আসারিয়া জানিয়েছেন, ব্রিটিশ মুসলিমদের এই নতুন প্রজন্ম যুক্তরাজ্যেই জন্মগ্রহণ করেছে এবং তারা অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিত। রাজনীতিকরা যদি এখনও তাদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে বিবেচনা করেন, তবে তারা ২০ বছর আগের পুরনো ধাঁচে পড়ে আছেন। কারণ এই তরুণেরা অংশ নেওয়ার জন্য কারোর অনুমতির অপেক্ষায় বসে নেই।

২০০১, ২০১১ এবং ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে মুসলিম সমাজ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাগুলোকে পুরনো হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মিকদাদ আসারিয়া জানান, মুসলিম ভোটারদের কেবল একটি নির্দিষ্ট ‘ব্লক’ হিসেবে দেখার প্রবণতা ভুল। ব্রিটিশ মুসলিমরা জাতিগত, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ব্র্যাডফোর্ডের পাকিস্তানি সম্প্রদায় থেকে শুরু করে কার্ডিফের সোমালি গোষ্ঠী, টাওয়ার হ্যামলেটসের বাংলাদেশি পরিবার কিংবা লন্ডনের আরব পেশাজীবী—সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মুসলিম এখানে বসবাস করেন যাদের রাজনৈতিক চিন্তাধারাও ভিন্ন।

ওয়ালভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির প্রভাষক মোহাম্মদ সিনান সিয়েচ বলেন, উগ্র ডানপন্থীদের উত্থান ও ইসলামফোবিয়া বেড়ে যাওয়ার এই সময়ে তরুণ মুসলিমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে রাজনীতিতে অনেক বেশি সক্রিয়। তারা বিকল্প সংবাদমাধ্যম এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে সরাসরি জ্ঞান অর্জন করছে। এই সচেতনতা তাদের ভোটের মাঠে আরও প্রভাবশালী করে তুলছে।

তবে সফলতার পাশাপাশি এই প্রতিবেদনে বৈষম্য ও সংগ্রামের চিত্রও ফুটে উঠেছে। প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মুসলিম পরিবার বা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবারে একা মা বা বাবা সন্তানদের লালন-পালন করছেন, যা জাতীয় গড় ৬ দশমিক ৯ শতাংশের চেয়ে বেশি। আবাসনের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে আছে এই জনগোষ্ঠী। যেখানে জাতীয়ভাবে গৃহমালিকানার হার ৬৩ শতাংশ, সেখানে মুসলমানদের ক্ষেত্রে তা মাত্র ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ। আসারিয়া মনে করেন, এটি কোনো সাংস্কৃতিক ব্যর্থতা নয় বরং গত ২০ বছরের কাঠামোগত বৈষম্যের ফসল। কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, নিম্নমানের আবাসন এবং মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বিনিয়োগের অভাব তাদের এই লড়াইকে কঠিন করে তুলেছে।

সব প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সামাজিক পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে এই পরিসংখ্যানে। গত দুই দশকে মুসলিম নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের হার ৩৭ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে ব্রিটিশ মুসলিমদের এক-তৃতীয়াংশেরই উচ্চতর ডিগ্রি রয়েছে, যা জাতীয় গড়ের কাছাকাছি। বিশেষ করে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী মুসলিম তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের হার এখন জাতীয় গড়কেও ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষিত এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন এই তরুণ প্রজন্মই আগামীর ব্রিটিশ জনজীবনে প্রধান ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

banner
Link copied!