সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ব্রেন ফ্রিজ বা আইসক্রিম হেডেকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কারণ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম

ব্রেন ফ্রিজ বা আইসক্রিম হেডেকের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কারণ

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে নিজের পছন্দের ঠান্ডা আইসক্রিম বা বরফ শীতল পানীয়ে চুমুক দেওয়ার আনন্দ অতুলনীয়। তবে এই আনন্দের মাঝেই হঠাৎ যদি মনে হয় মাথার ভেতরে কেউ ধারালো সুই ফুটিয়ে দিয়েছে, তখন পুরো মুহূর্তটাই মাটি হয়ে যায়। কপালের ঠিক মাঝখান থেকে শুরু হওয়া এই তীব্র ও আকস্মিক ব্যথাকে সাধারণ মানুষ ব্রেন ফ্রিজ বা আইসক্রিম হেডেক নামে চেনে। আপাতদৃষ্টিতে এই সমস্যাটিকে আমরা একটি সাময়িক অস্বস্তি হিসেবে অবহেলা করলেও চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। গবেষকদের মতে, এই সাময়িক মাথার ব্যথা আপনার শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অন্য কোনো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার আগাম সতর্কবার্তা হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটার বিখ্যাত মেয়ো ক্লিনিকের স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর আমাল স্টার্লিং জানান যে এই ধরনের মাথাব্যথা অত্যন্ত সাধারণ একটি ঘটনা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে কোল্ড স্টিমুলাস হেডেক বা ঠান্ডা উদ্দীপক মাথাব্যথা বলা হয়। এটি সাধারণত কোনো ক্ষতিকারক রোগ নয় এবং এটি খুব দ্রুত আসে আবার চলেও যায়। তবে কেন ঠান্ডা কিছু দ্রুত খেলে আমাদের মস্তিষ্ক এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তা বুঝতে চিকিৎসকরা কয়েক দশক ধরে মানব স্নায়ুতন্ত্রের ওপর গবেষণা চালিয়েছেন। এই গবেষণার ফল আমাদের সাধারণ শারীরিক প্রতিক্রিয়া এবং জটিল স্নায়বিক রোগের মধ্যকার সংযোগকে স্পষ্ট করেছে।

এখানেই শেষ নয়, তীব্র ঠান্ডা খাবার বা পানীয় গ্রহণের ফলে শরীরের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় একটি তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসে। যখন আমরা খুব দ্রুত বরফ শীতল কোনো খাবার খাই, তখন তা আমাদের মুখের ভেতরের ওপরের অংশ বা তালু এবং গলার পেছনের অংশে তীব্র শীতল আঘাত হানে। এই আকস্মিক ঠান্ডা আমাদের মুখের ভেতরের রক্তনালীগুলোকে অত্যন্ত দ্রুত সংকুচিত করে ফেলে। এর পরপরই শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে এবং রক্তপ্রবাহ সচল করতে রক্তনালীগুলো আবার বাধ্য হয়ে হঠাৎ করেই ফুলে ওঠে। রক্তনালীর এই দ্রুত সংকোচন ও প্রসারণের ফলে সেখানে থাকা ব্যথা সংবেদনশীল তন্তুগুলো উত্তেজিত হয়ে পড়ে।

এই ব্যথার সংকেত সরাসরি যুক্ত থাকে আমাদের মস্তিষ্কের ট্রাইজেমিনাল নার্ভ বা পঞ্চম ক্রেনিয়াল স্নায়ুর সঙ্গে। এই নির্দিষ্ট স্নায়ুটি আমাদের মুখমণ্ডল, চোখ এবং কপালের চারপাশের ব্যথার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। মুখের ভেতরের তালুতে রক্তনালীর পরিবর্তন ঘটলেও ট্রাইজেমিনাল নার্ভের সংবেদনশীলতার কারণে ব্যথার অনুভূতিটি মুখের ভেতর না হয়ে সরাসরি কপালে বা মাথার গভীরে অনুভূত হয়। চিকিৎসকরা একে রেফার্ড পেইন বা স্থানান্তরিত ব্যথা বলে থাকেন। মধ্যবয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই ঠান্ডা খাবার বা পানীয় কখনো কখনো হার্ট প্যালপিটেশন বা হৃদস্পন্দনের গতি বাড়িয়ে দিতে পারে, যা কোল্ড ড্রিংক হার্ট বা হৃদরোগের অনিয়মিত গতির অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত।বংশগত সংযোগ ও বৈশ্বিক গবেষণা

ইতালির ইউনিভার্সিটি অব পাডুয়ার শিশু স্নায়ুরোগ বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আইরিন টোল্ডো এবং তার সহকর্মীরা গত চার দশকের বৈশ্বিক গবেষণা পর্যালোচনা করেছেন। তারা তাইওয়ান, জার্মানি এবং কানাডার হাজার হাজার স্কুলগামী শিশু এবং যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও ব্রাজিলের প্রাপ্তবয়স্ক মাইগ্রেন রোগীদের ওপর করা সমীক্ষা বিশ্লেষণ করেন। এই দীর্ঘ গবেষণায় একটি বিশেষ দিক উন্মোচিত হয়েছে যা নির্দেশ করে যে ব্রেন ফ্রিজ বা আইসক্রিম হেডেকের সঙ্গে বংশগত বৈশিষ্ট্যের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কোনো ব্যক্তির বাবা-মার যদি ঠান্ডা জিনিস খাওয়ার পর এভাবে মাথা ব্যথার ইতিহাস থাকে, তবে সন্তানদের ক্ষেত্রেও এই সমস্যা দেখা দেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। যদিও বিজ্ঞানীরা এখনো এর জন্য দায়ী নির্দিষ্ট কোনো জিন চিহ্নিত করতে পারেননি।

গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো ব্রেন ফ্রিজের সঙ্গে সাধারণ মাথাব্যথা এবং মাইগ্রেনের সরাসরি সংযোগ। ডক্টর টোল্ডোর সমীক্ষায় দেখা গেছে যে যারা নিয়মিত মাইগ্রেনের সমস্যায় ভোগেন, তাদের ক্ষেত্রে ব্রেন ফ্রিজের তীব্রতা সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক বেশি হয়। ১৯৭০-এর দশকের একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় দেখা গেছে যে মাইগ্রেন আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৯৩ শতাংশই তীব্র আইসক্রিম হেডেকের সম্মুখীন হন। বিপরীতে, যাদের মাইগ্রেনের কোনো ইতিহাস নেই, তাদের মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যান। এর মূল কারণ হলো মাইগ্রেন রোগীদের ট্রাইজেমিনাল নার্ভ আগে থেকেই অতিরিক্ত সংবেদনশীল বা হাইপারসেনসিটিভ থাকে, যা ঠান্ডার সংস্পর্শে আসামাত্রই তীব্রভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে।মাইগ্রেনের লুকানো সংকেত এবং প্রতিরোধের উপায়

পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের প্রতি ছয়জন নারীর মধ্যে একজন, প্রতি এগারোজন শিশুর মধ্যে একজন এবং প্রতি দশজন পুরুষের মধ্যে একজন মাইগ্রেনের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় ভুগছেন। দুঃখজনক বিষয় হলো, মাইগ্রেনে আক্রান্ত রোগীদের অর্ধেকও কখনো এই বিষয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেননি বা সঠিক পরামর্শ নেননি। তারা অনেকেই এই তীব্র মাথা ব্যথাকে জীবনের একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন যে যদি আপনার বা আপনার সন্তানের আইসক্রিম খাওয়ার পর অস্বাভাবিক মাত্রায় তীব্র ব্রেন ফ্রিজ বা মাথা ব্যথা হয়, তবে তা সাধারণ কোনো বিষয় নাও হতে পারে। এটি আপনার শরীরে মাইগ্রেনের উপস্থিতির একটি বড় লক্ষণ হতে পারে যার জন্য সঠিক চিকিৎসা এবং রোগ নির্ণয় প্রয়োজন।

এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঠান্ডা খাবার বা পানীয় গ্রহণের গতি কমিয়ে দেওয়া। যখন আপনি ধীরে ধীরে আইসক্রিম খাবেন, তখন মুখের ভেতরের তালু আকস্মিক ঠান্ডার মুখোমুখি হবে না এবং রক্তনালীগুলো স্বাভাবিক থাকবে। তবে অসাবধানতাবশত যদি ব্রেন ফ্রিজ হয়েই যায়, তবে তা দ্রুত দূর করার বৈজ্ঞানিক উপায়ও রয়েছে। ডক্টর স্টার্লিং পরামর্শ দেন যে এমন পরিস্থিতিতে জিহ্বার নিচের অংশটি মুখের ওপরের তালুতে চেপে ধরা উচিত। জিহ্বার নিচের উষ্ণতা তালুকে দ্রুত গরম করতে সাহায্য করে। এছাড়া বুড়ো আঙুল মুখের তালুতে চেপে ধরে বা দ্রুত সামান্য হালকা গরম পানি পান করে এই তীব্র ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

banner
Link copied!