যুক্তরাজ্যের এক নারীর গর্ভে থাকা অবস্থায় তাঁর অনাগত শিশুর একটি বিরল জন্মগত ত্রুটি সফলভাবে মাতৃগর্ভে অস্ত্রোপচার করে সারিয়ে তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকরা, বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। লন্ডনের বাসিন্দা ঊনত্রিশ বছর বয়সী মেইজি স্যাভেজ যখন ছাব্বিশ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা, তখন অত্যন্ত জটিল এই চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। শিশুটির নাম রাখা হয়েছে থিও, যার বয়স এখন পাঁচ মাস এবং সে সম্পূর্ণ সুস্থভাবে বেড়ে উঠছে।
থিও মাতৃগর্ভে গ্যাস্ট্রোস্কিসিস নামক একটি গুরুতর জন্মগত সমস্যা নিয়ে বড় হচ্ছিল। এই বিরল ত্রুটির কারণে শিশুর নাভি সঠিকভাবে গঠিত হয় না এবং এর ফলে পেটের ভেতরের অন্ত্র শরীরের বাইরে বৃদ্ধি পেতে থাকে। টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মায়ের জরায়ু আংশিক উন্মুক্ত করে একটি ক্ষুদ্র ছিদ্র বা কিহোল তৈরি করেন। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে অনাগত শিশুটির বাইরের অঙ্গগুলো পুনরায় পেটের ভেতরে স্থাপন করা হয়। বিশ্বে মাত্র তৃতীয় শিশু হিসেবে থিও এই নতুন ধরনের পরীক্ষামূলক চিকিৎসার সুবিধা পেল।
যুক্তরাজ্যে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার শিশুর মধ্যে একজন এই গুরুতর জন্মগত ত্রুটিতে আক্রান্ত হয়। গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের সবচেয়ে জটিল ক্ষেত্রে জন্মের পর শিশুদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ছয় মাস পর্যন্ত কাটাতে হতে পারে। এ সময় তাদের একাধিক অস্ত্রোপচার এবং কৃত্রিমভাবে পুষ্টি সরবরাহের প্রয়োজন হয়। সর্বোচ্চ পর্যায়ের চিকিৎসাসেবা পাওয়ার পরও এই ধরনের জটিলতায় আক্রান্ত প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে অন্তত একজনের মৃত্যুঝুঁকি থাকে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
শিশুটির বাবা জশ ফ্রেঞ্চ জানান, গর্ভাবস্থার বিশ সপ্তাহের স্ক্যানের আগে তারা কেবল সন্তানের ছবি দেখার জন্য উদ্গ্রীব ছিলেন। কিন্তু চিকিৎসকদের কাছ থেকে গ্যাস্ট্রোস্কিসিসের কথা জানতে পেরে তারা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। প্রথমে লন্ডনের গ্রেট অরমন্ড স্ট্রিট হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাদের এই বিষয়ে সতর্ক করেন। পরে জটিলতা বেশি থাকায় তাদের যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস চিলড্রেনস হাসপাতালে ডক্টর মাইকেল বেলফোর্টের অধীনে পাঠানো হয়। ডক্টর বেলফোর্ট এর আগে স্পাইনা বিফিডা নামক আরেকটি রোগের মাতৃগর্ভে চিকিৎসায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
টেক্সাসে যাওয়ার আগে এই দম্পতিকে বেলজিয়ামের লিউভেন হাসপাতালে যেতে হয়েছিল। সেখানে বিশেষজ্ঞরা মায়ের জরায়ুর মাধ্যমে থিওর পেটের পেশি শিথিল করতে একটি বিশেষ বোটক্স ইনজেকশন প্রয়োগ করেন, যাতে পরবর্তী অস্ত্রোপচার সহজ হয়। গত বছরের নভেম্বরে মূল অস্ত্রোপচারের সময় বাইরে অপেক্ষারত জশের কাছে প্রতিটি মুহূর্ত চরম উদ্বেগের ছিল।
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষ এবং মানবজীবন রক্ষাকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, যে ব্যক্তি কারও প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতির প্রাণ রক্ষা করল (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৩২)। মাতৃগর্ভে থাকা একটি অসহায় শিশুর জীবন বাঁচাতে চিকিৎসকদের এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সাফল্য সেই পবিত্র বাণীরই এক বাস্তব প্রতিফলন।
