মানুষের হৃদরোগ বা কার্ডিওভাসকুলার সমস্যাগুলো কেবল কোনো বংশগত নিয়তি বা জিনগত কারণ নয়, বরং এটি দশকের পর দশক ধরে মানুষের নেওয়া হাজারো ছোট ছোট দৈনন্দিন ভুল সিদ্ধান্তের সম্মিলিত ফল। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এবং লন্ডনের হার্লে স্ট্রিটের দ্য ন্যাশনাল হার্ট ক্লিনিকের প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক ফ্রান্সেসকো লো মোনাকো তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসাজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে জানিয়েছেন যে অনেক মধ্যবয়সী মানুষ ভাবেন তাঁরা সুস্থ জীবনযাপন করছেন, কিন্তু অজান্তেই প্রতিদিন এমন কিছু ভুল করে বসছেন যা তাঁদের হৃদযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করছে। আধুনিক নগর জীবনে প্রতিদিনের কাজের ব্যস্ততা, ঘুমের অনিয়ম এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের ফাঁদে পড়ে মানুষ নিজের অজান্তেই স্ট্রোক বা হার্ট ফেইলিউরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন কীভাবে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই শরীরকে সুস্থ রাখতে পারে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা বাড়ছে।
হৃদরোগ এড়াতে মাঝবয়সীদের কিছু প্রচলিত অভ্যাস এখনই পরিবর্তন করা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, প্রতি রাতে আলাদা আলাদা সময়ে ঘুমানো এবং অপর্যাপ্ত ঘুম হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মধ্যবয়সী যারা প্রতি রাতে নিয়মিত আট ঘণ্টার কম ঘুমান এবং যাদের ঘুমের কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই, তাদের স্ট্রোক বা হার্ট ফেইলিউরের মতো মারাত্মক কার্ডিওভাসকুলার সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি দ্বিগুণ থাকে। অনিয়মিত ঘুম শরীরের স্বাভাবিক সার্কাডিয়ান রিদম বা জৈবিক ঘড়িকে ব্যাহত করে, যা সরাসরি কর্টিসল হরমোন বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ এবং ধমনীর ভেতরের প্রদাহের জন্য দায়ী। একই সঙ্গে শোবার ঘরে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ও ঘুমানোর ঠিক আগে স্ক্রিনের নীল আলো ধমনীকে সুরক্ষিত রাখা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মেলাটোনিন হরমোন উৎপাদনে বাধা দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে রক্তনালীর মারাত্মক ক্ষতি করে।
খাদ্যাভ্যাস ও লাইফস্টাইলের গোপন ফাঁদ
দৈনন্দিন খাবারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যকর মনে হওয়া অনেক সাধারণ উপাদানের পেছনে লুকিয়ে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণের পরিমাণকে মানুষ প্রায়শই অবমূল্যায়ন করে থাকে। বাজার থেকে কেনা সাধারণ স্যুপ, স্মোকড স্যামন, পাউরুটি, প্রক্রিয়াজাত মাংস কিংবা বিভিন্ন সসে অবিশ্বাস্য পরিমাণে লবণ থাকে, যা সাধারণ মানুষ খালি চোখে বুঝতে পারে না। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপের প্রধান কারণ, যা স্ট্রোক এবং হৃদরোগের একক বৃহত্তম পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত। চিকিৎসকদের মতে, একজন মানুষের দৈনিক সর্বোচ্চ ৬ গ্রাম লবণ খাওয়া উচিত, অথচ অনেকেই না জেনেই এর চেয়ে দ্বিগুণ লবণ গ্রহণ করছেন। এর বিপরীতে ওলিভ অয়েল সমৃদ্ধ ঐতিহ্যবাহী মেডিটেরিয়ান ডায়েট বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের খাদ্যাভ্যাস হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় অত্যন্ত কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অনেকেই ভাবেন সকালে একবার ভারী ব্যায়াম বা ওয়ার্কআউট করলেই সারাদিন ডেস্কে বসে থাকার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব, যা সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। আধুনিক ঘুম ও কর্মবিজ্ঞান বলছে, দিনে একটানা ১০ ঘণ্টার বেশি সময় বসে বা শুয়ে থাকা মানুষের অকাল কার্ডিওভাসকুলার মৃত্যুর ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়, যা সকালের এক ঘণ্টার ব্যায়াম দিয়েও প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। একটানা দীর্ঘ সময় বসে থাকলে শরীরে ভালো কোলেস্টেরল কমে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে ক্লট বা রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা তৈরি হয়। এই ক্ষতি এড়াতে প্রতি ৪৫ মিনিট পরপর ডেস্ক থেকে উঠে অন্তত দুই বা তিন মিনিটের জন্য হাঁটাচলা করা উচিত। নিয়মিত অ্যারোবিক ব্যায়াম রক্তচাপ কমায় এবং ধমনীর দেয়ালকে সচল ও স্থিতিস্থাপক রাখতে সাহায্য করে।
ওজন কমানোর সফরে থাকা অনেক মানুষই বাজারে থাকা `ফ্যাট-মুক্ত` বা লো-ফ্যাট পণ্যগুলোকে স্বাস্থ্যকর মনে করে বেছে নেন।
কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এই ফ্যাট-মুক্ত দই, সালাদ ড্রেসিং বা সিরিয়াল বারগুলোর স্বাদ ও টেক্সচার বজায় রাখতে উৎপাদকরা ফ্যাট বা চর্বির পরিবর্তে প্রচুর পরিমাণে চিনি, কৃত্রিম সুইটনার এবং অতিরিক্ত সোডিয়াম ব্যবহার করে। এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়িয়ে দেয় এবং ভালো এইচডিএল কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তৈরি করে। তাই হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় প্রক্রিয়াজাত ফ্যাট-মুক্ত খাবারের চেয়ে পরিমিত পরিমাণে ফুল-ফ্যাট বা প্রাকৃতিক খাবার গ্রহণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
অনিয়মিত রুটিন ও দৈনন্দিন ভুলসমূহ
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাঁত ও মুখের সুরক্ষায় অনেকেই বাজারে থাকা অত্যন্ত শক্তিশালী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল মাউথওয়াশ ব্যবহার শুরু করেন, যা হৃদরোগের জন্য আরেকটি বড় কারণ হতে পারে। এই তীব্র মাউথওয়াশগুলো মুখের ভেতরের সেই উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, যা খাবার থেকে রক্তনালী নমনীয় রাখার অত্যন্ত জরুরি উপাদান `নাইট্রিক অক্সাইড` তৈরি করতে সাহায্য করে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র মাউথওয়াশ ব্যবহারের ফলে রক্তনালী শিথিল হতে পারে না, যার ফলে ব্যায়াম করার পরও রক্তচাপ কমার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি ব্যাহত হয়। মুখের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই কৃত্রিম রাসায়নিকের চেয়ে প্রাকৃতিক লবণ-পানির কুলকুচা বা ওরাল প্রোবায়োটিক ব্যবহার করা অনেক বেশি নিরাপদ।
আধুনিক কর্পোরেট জীবনের আরেকটি বড় সংকট হলো রাতের বেলা ঘুমানোর ঠিক এক ঘণ্টা আগে ভারী ডিনার বা রাতের খাবার খাওয়া। দেরিতে খাবার খেলে শরীর যখন বিশ্রামে যাওয়ার কথা, তখন পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় রাখতে সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম অতিরিক্ত মাত্রায় উদ্দীপ্ত হয়, যা হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করলে রক্তনালীর ওপর চাপ কমে এবং ঘুমের মধ্যে হৃদপিণ্ড অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা রাতের উপবাসের সময়সীমা অন্তত দুই ঘণ্টা বাড়াতে পেরেছেন, তাদের রাতের রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন অনেক বেশি স্বাভাবিক থাকে।
মাঝবয়সে এসে শরীরে কিছুটা ক্ষতি হয়ে গেলেও মানুষের ধমনী ও রক্তনালীগুলো জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত দ্রুত সাড়া দেয়। তাই সঠিক সময়ে সচেতন হওয়া এবং ছোট ছোট দৈনিক অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমেই একটি সুস্থ ও শক্তিশালী হৃদযন্ত্র বজায় রাখা সম্ভব।
