যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবার ব্রেক্সিট ইস্যুতে নতুন মোড় নিয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতা ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) পুনরায় যোগদানের আহ্বানকে তীব্র আক্রমণ করেছেন বর্তমান সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী লিসা নান্দি। তিনি দাবি করেছেন, স্ট্রিটিংয়ের এই মন্তব্য দলটির সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভরাডুবি থেকে কোনো শিক্ষা না নেওয়ার প্রমাণ এবং এটি দেশে পুনরায় `ব্রেক্সিট যুদ্ধ` উসকে দেওয়ার শামিল। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে লেবার পার্টির এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন সম্পূর্ণ প্রকাশ্যে চলে এসেছে।
স্ট্রিটিংয়ের এই মন্তব্যের ফলে দলের ভেতর নতুন করে বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
গত শনিবার এক রাজনৈতিক ভাষণে ওয়েস স্ট্রিটিং ঘোষণা করেন যে তিনি ভবিষ্যতে কিয়ার স্টারমারের বিরুদ্ধে লেবার পার্টির নেতৃত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন এবং তাঁর মূল এজেন্ডা হবে যুক্তরাজ্যকে পুনরায় ইইউ-তে ফিরিয়ে নেওয়া। স্ট্রিটিং ব্রেক্সিটকে দেশের জন্য একটি `মহাবিপর্যয়কর ভুল` হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং ইউরোপের সঙ্গে একটি নতুন বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। এর পরপরই স্ট্রিটিং স্টারমার ক্যাবিনেট থেকে পদত্যাগ করেন এবং প্রধানমন্ত্রীর বিদায়ের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সূচি দাবি করেন। এই পরিস্থিতির মধ্যে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহ্যামও মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তিনিও স্ট্রিটিংয়ের মতো ইইউ-তে ফেরার পক্ষে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন বলে তাঁর সহযোগীরা জানিয়েছেন।
লিসা নান্দি রবিবার এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিংয়ের এই পরিকল্পনাকে অত্যন্ত অদ্ভুত এবং উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের সাধারণ ভোটারদের বাস্তব উদ্বেগের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্কাই নিউজকে বলেন, কিয়ার স্টারমার সরকার ব্রেক্সিটের ক্ষতি কাটিয়ে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে ইউরোপের সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে, সেখানে নতুন করে ব্রেক্সিট যুদ্ধ শুরু করা সম্পূর্ণ অনর্থক। নান্দির মতে, ইইউ-তে ফিরে যাওয়া যদি একমাত্র সমাধান হতো, তবে এর অর্থ দাঁড়াত ২০১৫ সালের পরিস্থিতি খুব ভালো ছিল, যা সম্পূর্ণ অসত্য। লেবার পার্টির এই শীর্ষ নেত্রী নিজের নির্বাচনী এলাকা উইগানের উদাহরণ টেনে বলেন যে ওখানকার মানুষ প্রথাগত রাজনীতির চেয়ে অনেক বড় এবং কার্যকর পরিবর্তন দেখতে চায়।
লেবার পার্টির এই অভ্যন্তরীণ ডামাডোলের সুযোগ নিয়ে তীব্র আক্রমণ শুরু করেছে বিরোধী দলগুলোও। কনজারভেটিভ পার্টির নেত্রী কেমি ব্যাডেনখ লেবার পার্টির সমালোচনা করে বলেছেন, ব্রেক্সিট নিয়ে পুরনো বিতর্ক নতুন করে শুরু করা প্রমাণ করে যে দলটির কাছে দেশের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তিনি দাবি করেন, ব্রিটিশ জনগণ এখন ব্রেক্সিটের সর্বোচ্চ সুবিধা কাজে লাগাতে চায় এবং লেবার পার্টি কেবল অতীতে ফিরে গিয়ে বহু বছরের অনর্থক আলোচনা ও কূটনীতি দিয়ে দেশকে স্থবির করে রাখতে চাইছে। ব্যাডেনখ উদাহরণ দিয়ে বলেন, জ্বালানি বিল থেকে গ্রিন ট্যাক্স বা ভ্যাট প্রত্যাহার করার মতো সুবিধাগুলো ইইউ-এর ভেতর থাকলে কোনো দেশ স্বাধীনভাবে করতে পারে না।
এদিকে নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী দল রিফর্ম ইউকেও অ্যান্ডি বার্নহ্যামের ইইউ-পন্থী অবস্থানকে তাদের নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান হাতিয়ার বানানোর পরিকল্পনা করেছে। ২০১৬ সালের গণভোটে মেকারফিল্ড এলাকার ৬৪ শতাংশ মানুষ ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট দিয়েছিল এবং সাম্প্রতিক স্থানীয় নির্বাচনে ওই এলাকায় রিফর্ম ইউকে বড় ধরনের জয় পেয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে।
লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্বের এই লড়াই আগামী গ্রীষ্মের মধ্যেই চূড়ান্ত রূপ নিতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কিয়ার স্টারমার বর্তমানে তাঁর দলের অভ্যন্তরে ওয়েস স্ট্রিটিং, অ্যান্ডি বার্নহ্যাম এবং ৪০ হাজার পাউন্ডের অনাদায়ী স্ট্যাম্প ডিউটি জটিলতা কাটিয়ে ওঠা অ্যাঞ্জেলা রেইনারের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছেন। ইউগভ ইউকের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ স্টারমারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন, যা তাঁকে যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে রেকর্ড অজনপ্রিয় করে তুলেছে।
