রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

জিলহজের চাঁদ দেখা গেলে কোরবানিদাতার করণীয় আমল ও মাসয়ালা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১৭, ২০২৬, ১০:১২ পিএম

জিলহজের চাঁদ দেখা গেলে কোরবানিদাতার করণীয় আমল ও মাসয়ালা

পবিত্র জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের মর্যাদা ও ইবাদতের গুরুত্ব ইসলামে অপরিসীম এবং এই বরকতময় দিনগুলোর প্রতিটি মুহূর্তকে মহান আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত সম্মানিত করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই বিশেষ দশটি রাতের কসম খেয়েছেন (সূরা আল-ফাজর, ৮৯:২) এবং রাসুলুল্লাহ (স.) স্পষ্ট ঘোষণা করেছেন যে জিলহজের প্রথম দশ দিনের আমলের চেয়ে অন্য কোনো দিনের আমল আল্লাহর কাছে বেশি উত্তম নয় (সহীহ আল-বুখারী, ৯৬৯)। বিশেষ করে হিজরি হজের এই মৌসুমে যারা কোরবানি দেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা রাখেন, তাদের জন্য এই দিনগুলোতে শরিয়ত ও সুন্নাহর বিশেষ কিছু জরুরি দিকনির্দেশনা রয়েছে।

চাঁদ দেখার পর থেকেই এই বিশেষ সতর্কতামূলক আমলগুলো শুরু করতে হয়।

হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, জিলহজ মাসের নতুন চাঁদ দেখার পর থেকে নিজের কোরবানি সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শরীরের কোনো অংশের চুল, নখ বা পশম না কাটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নাহ আমল। হজরত উম্মে সালামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা কোরবানি দেওয়ার ইচ্ছা করে, সে যেন জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত নিজের চুল ও নখ না কাটে (সহীহ মুসলিম, ১৯৭৭)। ওলামায়ে কেরাম ও ফকিহদের মতে এই আমলটি মোস্তাহাব বা সুন্নাত এবং এটি মূলত কোরবানির মূল মালিকের জন্য প্রযোজ্য, পরিবারের অন্য সাধারণ সদস্যদের জন্য এটি পালন করা আবশ্যক নয়। যদি কেউ ভুলবশত নখ বা চুল কেটে ফেলেন তবে তাঁর কোরবানি বাতিল হবে না, তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কাটলে সুন্নাহ আমলের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে।

এই বরকতময় দিনগুলোতে জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ, কারণ রাসুলুল্লাহ (স.) নিজে এই দিনগুলোতে রোজা রাখতেন (সুনানে আবু দাউদ, ২৪৩৭)। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ৯ জিলহজ বা আরাফাহর দিনের রোজা, যা নিয়ে নবীজি (স.) বলেছেন যে আরাফার রোজা পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের ক্ষতিপূরণ বা কাফফারা হিসেবে কাজ করবে (সহীহ মুসলিম, ১১৬২)। তবে যারা হজের ময়দানে অবস্থান করছেন, সেই হাজিদের জন্য আরাফাতের দিন রোজা না রাখাই সুন্নাত। একই সঙ্গে এই দিনগুলোতে ঘরে-বাইরে বেশি বেশি জিকির, তাহলিল ও তাকবির পাঠ করার জন্য কুরআনেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে (সূরা আল-হজ, ২২:২৮)।

এছাড়া ৯ জিলহজ ফজর সালাত থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত প্রতিটি ফরজ নামাজের পর একবার উচ্চস্বরে পুরুষদের জন্য এবং নিচুস্বরে নারীদের জন্য তাকবিরে তাশরিক পাঠ করা ওয়াজিব। ১০ জিলহজ ঈদের দিনের সবচেয়ে উত্তম আমল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা এবং রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন যে কোরবানির দিনে রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় আর কোনো আমল নেই (সুনানে তিরমিজি, ১৪৯৩)। কোরবানিদাতার জন্য ঈদের সালাতের আগে কিছু না খেয়ে থাকা এবং সালাত শেষে নিজের কোরবানির গোশত দিয়ে দিনের প্রথম আহার গ্রহণ করা একটি বিশেষ সুন্নাহ আমল। সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি ত্যাগের এক মহান পরীক্ষা।

সামর্থ্যের অভাবে যারা কোরবানি দিতে পারছেন না, তারাও যদি জিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে নখ-চুল না কেটে ঈদের দিন কাটেন, তবে আল্লাহ তাদের পূর্ণ কোরবানির সওয়াব দান করবেন বলে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া জমহুর ফকিহদের মতে, বড় পশু যেমন গরু বা উটের ক্ষেত্রে কোরবানির অংশের সঙ্গে আকিকার অংশ দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ। জিলহজের এই প্রথম দশ দিন মূলত মুমিনের ইবাদতের বসন্তকাল, তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত আমল ও তাকওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা।

banner
Link copied!