বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

গাজায় বিশ্বকাপ: যুদ্ধাহত ফুটবলারদের বেঁচে থাকার গল্প

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১১, ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

গাজায় বিশ্বকাপ: যুদ্ধাহত ফুটবলারদের বেঁচে থাকার গল্প

ছবি : সংগৃহীত

উত্তর আমেরিকার ঝকঝকে স্টেডিয়ামগুলোতে যখন ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধন নিয়ে বিশ্বজুড়ে উৎসবের আমেজ চলছে, তখন গাজা সিটির ধ্বংসস্তূপের মাঝে ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন আলি তাফেশ ও তাঁর সঙ্গীরা। তথাকথিত প্যালেস্টাইন স্টেডিয়ামের এক কোণে ক্রাচে ভর দিয়ে ফুটবল নিয়ে মেতে ওঠার চেষ্টা করছেন তাঁরা। মূলত গাজা আল-ইরাদা ফুটবল ক্লাবের সদস্য এই খেলোয়াড়রা ইসরায়েলি হামলায় হাত-পা হারিয়েছেন। যেখানে প্রায় ৭৩ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, সেখানে এই ফুটবলারদের কাছে খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়; এটি তাঁদের বেঁচে থাকার, মানসিকভাবে টিকে থাকার এবং হারিয়ে যাওয়া জীবনের টুকরো অংশকে পুনরুদ্ধারের এক মরিয়া প্রচেষ্টা।

মাত্র চার বছর আগে, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সময় ২৪ বছর বয়সী আলি তাফেশ গাজার এক ক্যাফেতে বন্ধুদের সাথে উৎসবমুখর পরিবেশে খেলা দেখেছিলেন। আজ পৃথিবী যখন আরেকটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সাক্ষী হচ্ছে, আলি তখন যুদ্ধাবস্থার মাঝে অঙ্গ হারানো হাজারো মানুষের একজন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাজা সিটির জেইতুন এলাকায় তাঁদের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আলির মা ও ভাই শহীদ হন এবং চিকিৎসকেরা আলির একটি পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন। এর আগে তিনি একজন স্থানীয় স্প্রিন্টার ছিলেন এবং আইন বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। পা হারানোর পর জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলা আলি ছয় মাস আগে বন্ধুদের মাধ্যমে গাজা আল-ইরাদা ক্লাবের খোঁজ পান। আল জাজিরাকে আলি জানান, পা কাটার পর তিনি জীবনের সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। তিনি একজন চ্যাম্পিয়ন ছিলেন, তাঁর মেডেল ছিল, কিন্তু এই ক্লাবের বন্ধুরা যখন তাঁর সাথে দেখা করতে এলেন, তিনি আবার খেলার প্রেরণা পেলেন। এখন তাঁরা খুব সামান্য যা আছে তা নিয়েই ফুটবলকে নতুন করে গড়ার চেষ্টা করছেন।

বিশ্বমঞ্চের তারকাদের সাথে এই অ্যাথলেটদের বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত। গাজায় কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থা সচল নেই। আলিকে দুই ঘণ্টা ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে মাঠে আসতে হয়। খেলার জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত ক্রাচ, বুট বা কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জামও তাঁদের কাছে নেই। দলের ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ খেলোয়াড় সাআদি আল-মাসরির গল্পটা কিছুটা ভিন্ন। দুই বছর বয়সে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় পা হারানো সাআদি একজন জাতীয় সাঁতারু, ভলিবল খেলোয়াড় এবং ফিলিস্তিনের জাতীয় অ্যামপুটি ফুটবল দলের প্রতিনিধি। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে দেশের পতাকা বহন করার অভিজ্ঞতাও তাঁর আছে। সাআদি জানান, বিশ্বকাপ দেখা তাঁদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তাঁদের দলটির এবার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের কোয়ালিফায়ার খেলার কথা ছিল, কিন্তু যুদ্ধ সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। তীব্র কষ্টের বিষয় হলো, আজ তাঁরা বিশ্বমঞ্চে অনুপস্থিত এবং পুরোপুরি বিস্মৃত।

সাআদি ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাঁর দাবি, ফিফা ফিলিস্তিনি ফুটবলের পুনর্গঠনে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেনি। যদিও গত ফেব্রুয়ারিতে ফিফা গাজায় ৫০টি মিনি-পিচ, ৫টি পূর্ণাঙ্গ স্টেডিয়াম ও একটি একাডেমি গড়ার ঘোষণা দিয়েছিল, কিন্তু সাআদিদের মতে, সেগুলো এখনো কেবল কাগজের প্রতিশ্রুতি হিসেবেই রয়ে গেছে। ২০২২ সালের সাথে তুলনা করে তিনি বলেন, তখন তাঁরা ঘরে বা ক্যাফেতে খেলা দেখতেন। আর আজ গাজায় বিদ্যুৎ নেই, স্ক্রিন নেই, এমনকি মোবাইলেও খেলা দেখার মতো ইন্টারনেট সুবিধা নেই।

২০১৮ সালের মে মাসে প্রতিষ্ঠিত গাজা আল-ইরাদা ক্লাবটি মূলত যুদ্ধ ও দুর্ঘটনায় অঙ্গ হারানো মানুষদের ক্রীড়াঙ্গনে ফিরিয়ে আনার কাজ করে আসছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে গাজায় প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মানুষ হাত বা পা হারিয়েছেন। ফিলিস্তিন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন গত মার্চের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলমান ইসরায়েলি হামলায় গাজার ক্রীড়াঙ্গনের ১০০০৭ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন, যার মধ্যে খেলোয়াড়, কোচ, রেফারি ও কর্মকর্তা রয়েছেন। এছাড়া ফুটবল মাঠ, জিমনেসিয়াম ও সুইমিং পুলসহ ২৬৫টি ক্রীড়া স্থাপনা সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। গাজার মূল স্টেডিয়ামগুলোর অনেকগুলোই এখন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

দলের কোচ হাতেম আল-মুগরেবি মোবাইল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপ করে জানান, বিশ্বকাপ তাঁদের কাছে ফুটবলের উৎসবের পাশাপাশি এক তীব্র একাকীত্ব ও বিচ্ছিন্নতার বার্তা নিয়ে এসেছে। তাঁদের খেলোয়াড়েরা বিশ্বের অন্য অ্যাথলেটদের মতো এই টুর্নামেন্ট উপভোগ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের ওপর প্রতিদিন বোমা আর মৃত্যুর মিছিল চলছে। আজ যখন বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ফুটবলাররা মাঠে নামবেন, তখন গাজার এই যোদ্ধাদের একটাই বার্তা—বিশ্ব যেন ফিলিস্তিনের মানুষদেরও বেঁচে থাকার যোগ্য মনে করে এবং গ্যালারি ও স্টেডিয়ামগুলোতে যেন ফিলিস্তিনের দুর্দশার কথা ফুটবলবিশ্ব ভুলে না যায়।

banner
Link copied!