শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ইরানের ১৩৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে ক্ষমা করলেন মোজতাবা খামেনি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ১৩, ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম

ইরানের ১৩৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে ক্ষমা করলেন মোজতাবা খামেনি

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেনি দেশটির বিভিন্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৩৯ জন বন্দির সাজা মওকুফ ও হ্রাস করার ঐতিহাসিক অনুমোদন দিয়েছেন বলে শনিবার তেহরানের বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে, আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে। ইরানের আধুনিক ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে একসাথে সাধারণ ক্ষমা বা সাজা হ্রাসের ঘটনা সম্পূর্ণ বিরল এবং নজিরবিহীন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। তেহরানের বিচার বিভাগীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে যে এই মানবিক সিদ্ধান্তটি দেশের আইনি ব্যবস্থার ইতিহাসে একটি নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই ক্ষমার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য দেশের শীর্ষ আইনি ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা বেশ কয়েক মাস ধরে বন্দিদের প্রতিদিনের আচরণ ও মানসিক সংশোধনের বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

ইরানের বিচার বিভাগের কেন্দ্রীয় মুখপাত্র আসগার জাহাঙ্গীর তেহরানে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করেন। তিনি গণমাধ্যমকে স্পষ্ট করে বলেন যে দেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম কোনো একক আদেশে এত বেশি সংখ্যক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিকে সরাসরি সাধারণ ক্ষমার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। মুখপাত্র আরও জানান যে এই বিশেষ ক্ষমার তালিকার অন্তর্ভুক্ত কোনো বন্দির বিরুদ্ধে আদালতে কোনো ব্যক্তিগত বা দেওয়ানি অভিযোগকারী ছিল না এবং তারা কেউই দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। কারাগারে দীর্ঘকালীন বন্দিদশায় তাদের আচরণ অত্যন্ত সন্তোষজনক হওয়া, নিজেদের কৃতকর্মের জন্য আন্তরিক অনুশোচনা প্রকাশ করা এবং কারাগারের অভ্যন্তরীণ সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সফলভাবে যাওয়ার কারণেই তারা এই ঐতিহাসিক ক্ষমার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।

ইরানের বিদ্যমান শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দেশটির বিচার বিভাগীয় প্রধানের লিখিত সুপারিশ এবং চুলচেরা পর্যালোচনার ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নেতা যেকোনো বন্দির সাজা সম্পূর্ণ মওকুফ কিংবা আংশিক কমানোর একক আইনি ও সাংবিধানিক ক্ষমতার অধিকারী। তবে এই নজিরবিহীন ক্ষমার তালিকায় রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ কিছু নির্দিষ্ট জঘন্য অপরাধের আসামিদের সম্পূর্ণরূপে বাইরে রাখা হয়েছে। বিচার বিভাগের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা, দেশের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংঘাত বা বিদ্রোহে লিপ্ত হওয়া, বিদেশি রাষ্ট্রের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করা, আন্তর্জাতিক অস্ত্র পাচার, সহিংস অপহরণ, বড় ধরনের মাদক চোরাচালান, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের বড় অংকের ঘুষ প্রদান এবং জনসাধারণের অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত কোনো অপরাধীকে এই ক্ষমার তালিকায় বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক লিপি ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের বুকে গণচীন বা চীনের পরেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ হিসেবে ইরানের অবস্থান দীর্ঘকাল ধরে শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটিতে সাধারণত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক ধর্ষণ এবং রাষ্ট্রদ্রোহী গুপ্তচরবৃত্তির মতো চরম অপরাধের চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আইনি বিধান রয়েছে। সাধারণত অত্যন্ত গোপনীয়তায় অত্যন্ত ভোরবেলায় ফাঁসির মঞ্চে ঝুলিয়ে আসামিদের এই দণ্ড কার্যকর করা হলেও এবার একসাথে এত মানুষের জীবন বাঁচানোর সিদ্ধান্ত দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই ব্যাপক ক্ষমার সিদ্ধান্তটির ফলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মঞ্চে ইরানের ভাবমূর্তি দীর্ঘমেয়াদে কতটা ইতিবাচকভাবে পরিবর্তিত হবে এবং এটি বিচার ব্যবস্থার স্থায়ী কোনো সংস্কারের অংশ কি না কারণ দেশটির আইনি ব্যবস্থার কঠোরতা নিয়ে অতীতে বহু আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। উম্মাহ কণ্ঠ এই আইনি সংস্কার এবং এর পরবর্তী প্রভাবগুলোর ওপর নিবিড় নজর রাখছে।

banner
Link copied!