দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামি শরিয়তে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং সামাজিক দায়িত্ব। মহান আল্লাহ তাআলা দেশ ও জনগণের সুরক্ষায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা ধৈর্য ধরো ও ধৈর্যে অটল থাকো এবং পাহারায় নিয়োজিত থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো, যাতে সফল হও (সুরা আলে ইমরান, ৩:২০০)। ইসলামি পরিভাষায় এই সতর্ক প্রহরাকে বলা হয় রিবাত। এই আমলটির এমন সব ফজিলত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, যা অন্য অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ।
মহানবী (সা.) সীমান্ত পাহারার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও একে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন। হজরত সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম (সহীহ বুখারী, ২৮৯২)। এই হাদিসটি স্পষ্ট করে দেয় যে, পার্থিব জগতের সমস্ত ভোগ-বিলাস ও সম্পদ আল্লাহর পথে প্রহরার মর্যাদার সামনে অতি নগণ্য।
সীমান্ত পাহারার মর্যাদা কতটা সুদূরপ্রসারী, তা একটি হাদিস থেকে বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়। হজরত সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর পথে একদিন ও একরাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম (সহীহ মুসলিম, ১৯১৩)। ইসলামে সাধারণত মৃত্যুর সাথে সাথে মানুষের আমল বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু সীমান্ত পাহারার বিষয়টি ব্যতিক্রম। একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তাহলে তার আমলের প্রতিদান চলতে থাকবে, তার জন্য রিজিক অব্যাহত থাকবে এবং সে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপত্তা লাভ করবে (সহীহ মুসলিম, ১৯১৩)।
যারা দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রাত জেগে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) অন্য একটি হাদিসে বলেছেন, আমি কি তোমাদের কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ রাতের কথা জানাব না? সে ওই পাহারাদারের রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে সে হয়তো তার পরিবারে জীবিত ফিরতে পারবে না (মুসতাদরাক হাকেম, ২৪২৪)। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। এক, যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায় এবং দুই, যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয় (সুনানে তিরমিজি, ১৬৩৯)।
সীমান্ত রক্ষায় নিয়োজিত সাহাবিদের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। হুনাইনের যুদ্ধের রাতে পাহারার দায়িত্ব পালনকারী সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) সারা রাত গিরিপথ পাহারা দিয়েছিলেন। সকালে রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে সুসংবাদ দিয়ে বললেন, তুমি তোমার জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ (সুনানে আবু দাউদ, ২৫০১)। এভাবেই ইসলাম ইবাদতের পাশাপাশি দেশের নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণে নিবেদিত কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে দায়িত্ব পালন করছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তার নিয়তে এই দায়িত্ব পালন করলে তারাও হাদিসে বর্ণিত এই ফজিলত ও মর্যাদার অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন। ইসলামের দৃষ্টিতে দেশের নিরাপত্তা প্রহরা কেবল একটি পেশাগত দায়িত্ব নয়, বরং এটি একটি মহান ইবাদত, যার সওয়াব ইহকাল ও পরকালে অব্যাহত থাকে।
