‘ঝুমকো লতায় জোনাকি—/ মাঝে মাঝে বিষ্টি গো/ আবল তাবল বকে কে/ তারও চেয়ে মিষ্টি গো/ মিষ্টি মিষ্টি।’— জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘ঝুমকো লতায় জোনাকি’ কবিতায় এভাবেই আমাদের চিরচেনা প্রকৃতির এক মায়াবী রূপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আঁধার রাতে গ্রামীণ ঝোপঝাড়ে আলোর হারিকেন জ্বালিয়ে প্রকৃতিতে মিটিমিটি আলো ছড়ানো এই ছোট্ট পোকাটির সঙ্গে আমাদের অনেকেরই শৈশবের সোনালী স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
গ্রামের মেঠোপথ কিংবা ঘরের পেছনের বাঁশঝাড়ে জোনাকির আলোর নাচ দেখে মুগ্ধ হননি, এমন মানুষ মেলা ভার। তবে এক সময়কার অত্যন্ত সাধারণ এই প্রাকৃতিক দৃশ্যটি এখন রূপকথার গল্পে পরিণত হতে চলেছে। বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক এক পূর্বাভাস দিয়ে জানিয়েছেন যে আমরাই সম্ভবত পৃথিবীর শেষ প্রজন্ম, যারা প্রকৃতির এই জাদুকরী আলো এখনও সরাসরি দেখার সুযোগ পাচ্ছি।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ বা আইইউসিএন এবং বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট কীটতত্ত্ববিদদের সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়েই জোনাকি পোকা বিলুপ্তির পথে ধাবিত হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে আলো ছড়ানো এই অনন্য নিশাচর পতঙ্গটি মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত পর্যায় রয়েছে। গবেষকরা এই পতঙ্গের দ্রুত হারিয়ে যাওয়ার পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণকে চিহ্নিত করেছেন।
এগুলো হলো মানুষের তৈরি তীব্র কৃত্রিম আলোক দূষণ, কৃষিকাজে রাসায়নিক কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তাদের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক বাসস্থান সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। এই পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো জোনাকির বেঁচে থাকার লড়াইকে দিন দিন কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলছে।
আলোক দূষণ ও বংশবৃদ্ধির গভীর সংকট
একটি জোনাকির বেঁচে থাকা এবং স্বাভাবিক বংশবৃদ্ধির জন্য মূলত ভেজা স্যাঁতসেঁতে মাটি, ঘন ঝোপঝাড়, লতাগুল্ম এবং বনাঞ্চল অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান আধুনিক যুগে মানুষের বসতি স্থাপন এবং অপরিকল্পিত শিল্পায়নের ফলে তাদের এই নিরাপদ প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থলগুলো প্রতিদিন নিয়ম করে হারিয়ে যাচ্ছে। জোনাকির জীবনচক্রের একটি বড় অংশ কাটে মাটির নিচে বা স্যাঁতসেঁতে ভেজা পাতায়, যেখানে তাদের লার্ভা বা ডিম্বাণু বড় হয়। আধুনিক কংক্রিটের অবকাঠামো তৈরির কারণে এই মাটিগুলো তাদের আর্দ্রতা হারাচ্ছে, যার ফলে জোনাকির নতুন প্রজন্ম পৃথিবীর আলো দেখার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে অবধারিতভাবে যুক্ত হয়েছে আধুনিক রাতের শহরের অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম আলো।
রাতের অন্ধকারকে জয় করার জন্য মানুষ যে নিয়ন আলো, এলইডি স্ট্রিটলাইট এবং বিশালাকার বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড ব্যবহার করছে, তা জোনাকিদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। জোনাকি পোকার শরীরে লূসিফেরিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতির কারণে প্রাকৃতিকভাবে আলো জ্বলে। এই আলোর মূল কাজ হলো ঘন অন্ধকারে নিজের বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গীকে আকর্ষণ করা এবং বংশবিস্তার করা।
একেকটি নির্দিষ্ট প্রজাতির জোনাকির আলোর সংকেত বা ফ্ল্যাশিং প্যাটার্ন একেক রকম হয়। কিন্তু রাতের শহরের তীব্র কৃত্রিম আলো জোনাকিদের এই নিজস্ব রাসায়নিক আলোর কার্যকারিতা এবং দৃশ্যমানতাকে সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিচ্ছে। ফলস্বরূপ, ঘন অন্ধকারের অভাবে এরা একে অপরকে খুঁজে পেতে এবং বংশবিস্তার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছে, যা তাদের সামগ্রিক প্রজাতিকে এক বিশাল শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের চিত্র ও আইনি সুরক্ষার তাগিদ
কৃত্রিম আলোর এই ভয়াবহ আধিক্য এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের প্রভাব থেকে চিরসবুজ বাংলাদেশও মুক্ত থাকতে পারেনি। জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং গ্রামীণ বনাঞ্চল কেটে ফেলার কারণে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকেও জোনাকির আলো এখন প্রায় দেখাই যায় না বললেই চলে। অথচ দুই দশক আগেও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঝোপঝাড় রাতে জোনাকির আলোয় আলোকিত থাকত।
পরিবেশবিদদের মাঠপর্যায়ের সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে কেবল চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের কিছু গভীর পাহাড়ি অঞ্চল এবং প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত গ্রামীণ বনাঞ্চলে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এদের অস্তিত্ব কোনোমতে টিকে আছে। শহরের কাছাকাছি থাকা গ্রামীণ অঞ্চলগুলো থেকেও জোনাকিরা তাদের পাততাড়ি গুটিয়েছে অনেক আগেই।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০১২ অনুযায়ী, ইতিমধ্যে জোনাকিদের অফিশিয়ালি বা সরকারিভাবে বিপন্নপ্রায় বন্যপ্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, জোনাকি পোকা কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
জোনাকির লার্ভা মূলত ক্ষতিকারক শামুক, ঝিনুক এবং ফসলের ক্ষতিসাধনকারী বিভিন্ন পোকা মাকড় খেয়ে কৃষকের প্রাকৃতিক বন্ধু হিসেবে কাজ করে। জোনাকির অনুপস্থিতি গ্রামীণ খাদ্যশৃঙ্খলে একটি বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। প্রকৃতির এই মায়াবী আলোর রূপ চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার আগেই আমাদের কৃত্রিম আলোর ব্যবহার সীমিত করা, বনাঞ্চল রক্ষা এবং পরিবেশের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল ও সচেতন হওয়া জরুরি।
