সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

মাংস খেয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর ৪টি কার্যকরী ঘরোয়া উপায়

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম

মাংস খেয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর ৪টি কার্যকরী ঘরোয়া উপায়

কোরবানির ঈদ বা যেকোনো বড় পারিবারিক উৎসবে আমাদের দেশের খাদ্যতালিকায় মাংসের আধিপত্য দেখা যায়। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে দুপুরের ভুরিভোজ এবং রাতের রাজকীয় আয়োজন— সবখানেই থাকে গরু, খাসি কিংবা মহিষের মাংসের হরেক রকম মুখরোচক পদ। রেজালা, কাবাব, কোপ্তা কিংবা ভুনা মাংসের এই স্বাদ জিভে জল আনলেও টানা কয়েক দিন ধরে অতিরিক্ত মাংসপ্রীতি শরীরের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। 

বিশেষ করে উৎসবের দিনগুলো শেষ হওয়ার পর একটি বড় সমস্যার মুখোমুখি হন অধিকাংশ মানুষ। টয়লেটে গিয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, পেট ভার হয়ে থাকা এবং মলত্যাগের তীব্র যন্ত্রণায় ভোগা খুবই সাধারণ একটি চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফলে পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা ব্যাহত হওয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি শারীরিক প্রতিক্রিয়া।

এই সমস্যার মূল কারণটি লুকিয়ে আছে মাংসের পুষ্টিগত উপাদানের মধ্যে। গরুর বা খাসির মাংসে প্রচুর পরিমাণে অ্যানিমেল প্রোটিন বা প্রাণিজ আমিষ এবং চর্বি থাকে, কিন্তু এতে কোনো ধরনের ডায়েটরি ফাইবার বা খাদ্যআঁশ থাকে না। আমাদের পরিপাকতন্ত্রকে সচল রাখতে এবং মলকে নরম করে শরীর থেকে সহজে বের করে দিতে ফাইবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন খাদ্যতালিকায় শুধুমাত্র মাংস থাকে এবং শাকসবজি বা আঁশযুক্ত খাবার পুরোপুরি বাদ পড়ে যায়, তখন অন্ত্রের নড়াচড়া বা গাট মোটিলিটি ধীর হয়ে যায়। চর্বি ও প্রোটিন হজম হতে এমনিতেই অনেক বেশি সময় লাগে। ফলে দীর্ঘ সময় পরিপাক নালীতে অবস্থান করার কারণে মল শক্ত ও শুষ্ক হয়ে যায়, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্ম দেয়।

অন্ত্রের নড়াচড়া স্বাভাবিক করার ঘরোয়া সমাধান

মাংস খেয়ে কোষ্ঠকাঠিন্য শুরু হলে প্যানিক বা আতঙ্কিত না হয়ে কিছু সুনির্দিষ্ট ঘরোয়া পদক্ষেপ গ্রহণ করলে দ্রুত স্বস্তি পাওয়া সম্ভব। পরিপাকতন্ত্রের এই জটিলতা দূর করার জন্য সবচেয়ে প্রাথমিক এবং প্রধান হাতিয়ার হলো প্রচুর পরিমাণে পানি পান করা। মাংসে থাকা উচ্চমাত্রার প্রোটিন বিপাক বা মেটাবলিজম প্রক্রিয়ার জন্য শরীরের প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। 

শরীরে পানির ঘাটতি দেখা দিলে অন্ত্র মল থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করে নেয়, যার ফলে মল আরও বেশি শক্ত হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি এড়াতে সারাদিনে অন্তত ৮ থেকে ১০ গ্লাস বা আড়াই থেকে তিন লিটার নিরাপদ পানি পান করা বাধ্যতামূলক। হালকা কুসুম গরম পানি পান করতে পারলে তা অন্ত্রের ভেতরের নালীগুলোকে শিথিল করতে এবং মল নিষ্কাশন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে আরও বেশি সাহায্য করে।

পানির পাশাপাশি খাদ্যতালিকায় দ্রুত ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবারের অনুপাত বাড়িয়ে দিতে হবে। শুধুমাত্র মাংসের পদ দিয়ে পেট না ভরে প্রতি বেলার খাবারের সাথে পর্যাপ্ত পরিমাণে কাঁচা সবজির সালাদ, শসা, টমেটো এবং লেবু যুক্ত করা উচিত। এই সময়ে পেঁপে, মিষ্টি কুমড়া, লাউ কিংবা ঝিঙের মতো সহজপাচ্য সবজি মাংসের ঝোলে বা আলাদাভাবে রান্না করে খাওয়া যেতে পারে। খোসাসহ ফলমূল যেমন— আপেল, পেয়ারা কিংবা পাকা পেঁপে কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে জাদুর মতো কাজ করে। আঁশযুক্ত খাবারগুলো অন্ত্রের ভেতরে পানির সাথে মিশে মলের আয়তন বৃদ্ধি করে এবং একে নরম রাখতে সাহায্য করে, যা কোনো ধরনের কৃত্রিম ওষুধ ছাড়াই পেট পরিষ্কার করতে অত্যন্ত কার্যকর।

পারিবারিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং পরীক্ষিত উপাদান হলো ইসবগুলের ভুসি। এটি মূলত একটি প্রাকৃতিক ল্যাক্সেটিভ যা অন্ত্রের ভেতরের বর্জ্যকে পিচ্ছিল করে বের করে দিতে সাহায্য করে। প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে অথবা সকালে খালি পেটে এক গ্লাস পানিতে এক থেকে দুই চামচ ইসবগুলের ভুসি মিশিয়ে সাথে সাথে পান করে নিতে হবে। ভুসি পানিতে ভিজিয়ে দীর্ঘ সময় রেখে দিলে এর কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়। ইসবগুলের ভুসি অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া বা প্রোবায়োটিকের খাদ্য হিসেবেও কাজ করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পেটের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ভালো রাখে। তবে ইসবগুলের ভুসি খাওয়ার পর শরীরে পানির চাহিদা বেড়ে যায়, তাই এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পানের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

শারীরিক সক্রিয়তা এবং চিকিৎসকের জরুরি পরামর্শ

উৎসবের দিনগুলোতে অতিরিক্ত খাওয়ার পর আমাদের মধ্যে একটি অলসতা কাজ করে। অনেকেই ভারী খাবার খাওয়ার পরপরই বিছানায় শুয়ে পড়েন বা সোফায় বসে টেলিভিশন দেখেন। এই ধরনের অলস জীবনযাপন পরিপাকক্রিয়াকে আরও অলস করে তোলে। খাওয়ার পর পরই শুয়ে পড়ার অভ্যাস পাকস্থলীর এসিডকে ওপরের দিকে ঠেলে দেয়, যার ফলে বুক জ্বালাপোড়া এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থেকে বাঁচতে প্রতিবার ভারী খাবার গ্রহণের পর অন্তত ১৫ থেকে ২০ মিনিট ঘরের ভেতর বা বারান্দায় হালকা হাঁটাচলা করা উচিত। এই সামান্য শারীরিক সক্রিয়তা আমাদের অন্ত্রের পেশীগুলোকে উদ্দীপিত করে, যা খাবারকে পরিপাক নালীর ভেতর দিয়ে নিচের দিকে নামিয়ে দিতে সাহায্য করে।

এর পাশাপাশি মনে রাখতে হবে যে কোষ্ঠকাঠিন্য কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যত্রতত্র বাজারচলতি কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করার ট্যাবলেট বা জোলাপের ওষুধ খাওয়া একদমই উচিত নয়। এই ধরনের ওষুধ সাময়িক উপশম দিলেও দীর্ঘমেয়াদে অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান। তবে কোষ্ঠকাঠিন্যের পাশাপাশি যদি কোনো ব্যক্তির পেটে তীব্র মোচড় বা অসহ্য ব্যথা, অনবরত বমি বমি ভাব, পেট অতিরিক্ত ফুলে যাওয়া কিংবা পায়খানার সাথে রক্ত যাওয়ার মতো জটিল উপসর্গ দেখা দেয়, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। এগুলো অন্ত্রের কোনো গুরুতর প্রতিবন্ধকতা বা অন্য কোনো অভ্যন্তরীণ জটিলতার লক্ষণ হতে পারে। সচেতনতা এবং সুষম খাদ্য্যাভ্যাসই পারে উৎসবের আনন্দকে বিষাদে রূপ নেওয়া থেকে রক্ষা করতে।

banner
Link copied!