সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ফেসবুক মেমোরি আমাদের হাসায় নাকি কাঁদায়: নস্টালজিয়ার মনস্তত্ত্ব

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম

ফেসবুক মেমোরি আমাদের হাসায় নাকি কাঁদায়: নস্টালজিয়ার মনস্তত্ত্ব

সকালের চেনা ব্যস্ততার মধ্যে হঠাৎ করেই যখন হাতের স্মার্টফোনটি মৃদু কম্পনে জানান দেয় একটি নতুন নোটিফিকেশন, তখন আমাদের অনেকেরই দৈনন্দিন রুটিনে এক মুহূর্তের জন্য বিরতি আসে। স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি চেনা বার্তা— "You have memories to look back on"। কৌতূহলবশত সেই লিংকে আলতো ছুঁয়ে দিতেই চোখের সামনে উন্মোচিত হয় এক সুদূর অতীত। চার বছর আগের কোনো এক মেঘলা দিনে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার ছবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের চেনা ক্যাম্পাসের সবুজ লন, কিংবা পরিবারের কোনো হারানো উৎসবের মুহূর্ত। সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে সময়ের অদৃশ্য চাকা যেন উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করে। 

ধুলোবালি জমে থাকা স্মৃতির খেরোখাতা থেকে জীবন্ত হয়ে ওঠে এমন কিছু দিন, যা আমরা দৈনন্দিন জীবনের জটিলতায় হয়তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। মেটা মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের এই ‍‍`মেমোরি‍‍` বা স্মৃতি ফিরিয়ে দেখার ফিচারটি মূলত আমাদের অতীতকে এনে দাঁড় করিয়ে দেয় বর্তমানের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। এটি কখনো আমাদের মুখে চওড়া হাসি ফোটায়, আবার কখনো কোনো এক নিভৃত কোণে অজান্তেই চোখের কোণ ভিজিয়ে দেয়। এই দ্বিমুখী আচরণ থেকেই একটি মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন সামনে আসে— ফেসবুক মেমোরি আসলে আমাদের হাসায়, নাকি কাঁদায়?

ডিজিটাল নস্টালজিয়া এবং মনের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব

একটা সময় ছিল যখন মানুষের স্মৃতি ধরে রাখার একমাত্র মাধ্যম ছিল ফিজিক্যাল বা কাগজের ফটো অ্যালবাম। আলমারির গভীর থেকে সেই ভারী অ্যালবাম বের করে ধুলো ঝেড়ে পুরোনো ছবি দেখার জন্য একটি বিশেষ অবসরের প্রয়োজন হতো। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাগজের অ্যালবাম এখন জায়গা করে নিয়েছে আমাদের হাতের মুঠোয়, ক্লাউড স্টোরেজে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছবি বা স্ট্যাটাস পোস্ট করা এখন আর কেবল একটি সাধারণ কর্মকাণ্ড নয়, এটি মূলত নিজের জীবনের একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তকে চিরকালের জন্য ফ্রেমবন্দি করে রাখার আধুনিক ডিজিটাল উপায়। 

প্রথম কর্মক্ষেত্রে যোগদানের প্রথম দিন, কোনো প্রিয় মানুষের জন্মদিনের ঘরোয়া আয়োজন, কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে শেষ বেঞ্চে বসে কাটানো আড্ডার মুহূর্তগুলো যখন বছর ঘুরে আবার স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, তখন তা মানব মস্তিষ্কে এক ধরনের ইতিবাচক হরমোনের ক্ষরণ বাড়ায়। পুরোনো বন্ধুদের হারিয়ে যাওয়া যোগাযোগ এই ফিচারের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত হয় এবং মানুষ তার ফেলে আসা সোনালী দিনগুলোর কথা ভেবে এক ধরনের মানসিক প্রশান্তি লাভ করে।

ডিজিটাল মাধ্যমের এই স্মৃতি রোমন্থনকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন এই খাতের পেশাদাররা। বিজ্ঞাপনী সংস্থা ডিজিহুকের ক্রিয়েটিভ এক্সিকিউটিভ কামরান চৌধুরী এই বিষয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানান যে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সুন্দর ও অর্থপূর্ণ কিছু মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে ফেসবুক মেমোরিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মানুষের মনকে ক্ষণিকের জন্য হলেও এক অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতিতে ভরিয়ে দেয়। মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, এই ধরনের ইতিবাচক নস্টালজিয়া মানুষের বর্তমানের মানসিক চাপ এবং একাকীত্ব দূর করতে দারুণভাবে সাহায্য করে। ব্যস্ত জীবনযাত্রার মাঝে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের একটি সুন্দর অতীত ছিল, যা আমাদের বর্তমান অস্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করেছে।

স্মৃতির অপর পিঠ ও সময়ের নির্মম বাস্তবতা

তবে মুদ্রার যেমন দুটি পিঠ থাকে, তেমনি ফেসবুক মেমোরিরও একটি অন্ধকার বা বেদনাদায়ক দিক রয়েছে যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ফেসবুকের অ্যালগরিদম কেবল একটি নির্দিষ্ট তারিখের ছবি বা পোস্টকে সামনে এনে দেয়, কিন্তু সেই ছবির পেছনে থাকা মানুষের বর্তমান সম্পর্কের সমীকরণটি বুঝতে সে সম্পূর্ণ অক্ষম। অ্যালগরিদম জানে না যে ছবির যে মানুষটিকে জড়িয়ে ধরে আপনি একদিন ভালোবাসার আবেগী পোস্ট দিয়েছিলেন, আজ তার সঙ্গে আপনার আর কোনো যোগাযোগ নেই, কিংবা সেই সম্পর্কটি এক তিক্ত বিচ্ছেদের মাধ্যমে শেষ হয়ে গেছে। 

এটি আরও জানে না যে পাঁচ বছর আগের পারিবারিক ছবিতে যে হাসিমুখের প্রবীণ মানুষটি বসে ছিলেন, তিনি হয়তো গত বছরই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছেন। ফলে কোনো ধরনের আগাম সতর্কতা ছাড়াই যখন এই ধরনের পোস্টগুলো হঠাৎ চোখের সামনে আসে, তখন তা বুকের ভেতর লুকিয়ে থাকা পুরনো ক্ষতগুলোকে নতুন করে তাজা করে তোলে।

স্মৃতির এই অদ্ভুত চরিত্রের কারণেই একই ছবি সময়ের ব্যবধানে মানুষের অনুভূতিকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। স্মৃতি কখনো নিজে বদলায় না, বদলে যায় কেবল মানুষের বর্তমান পরিস্থিতি ও অবস্থান। যে ছবিতে পাঁচ বছর আগে কেবলই আনন্দের ছটা ছিল, সময়ের নির্মম গতিতে আজ সেখানে খুঁজে পাওয়া যায় বিচ্ছেদ, পরিবর্তন কিংবা এক গভীর শূন্যতা। একজন নিয়মিত ফেসবুক ব্যবহারকারী এই বেদনার জায়গাটি চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি জানান যে, স্মৃতি সবসময়ই মানুষকে এক ধরনের সূক্ষ্ম কষ্ট দেয়, তা সুখের হোক বা দুঃখের। 

প্রতিদিন রাত ১২টায় ফেসবুক মেমোরি চেক করা এখন অনেকের কাছে একটি অবচেতন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই মেমোরি দেখতে গিয়ে মানুষ কখনো পুরোনো দিনগুলোর কথা ভেবে উচ্ছ্বসিত হয়, আবার কখনো এক গভীর বিষাদ তাদের চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে। পুরোনো লেখায় এমন অনেক মানুষের মন্তব্য বা রিয়্যাক্ট চোখে পড়ে, যাদের সঙ্গে এখন আর কোনো যোগাযোগ নেই, এমনকি কেউ কেউ হয়তো আজ আর এই পৃথিবীতেও বেঁচে নেই।

নস্টালজিয়ার এই তীব্র শক্তির কারণেই মানুষ বারবার কষ্টের মুখোমুখি হয়েও সেই নোটিফিকেশনে ক্লিক করে। বর্তমানের অতি-প্রতিযোগিতামূলক এবং যান্ত্রিক জীবনের ভিড়ে আমরা প্রতিনিয়ত কতটা পথ পেরিয়ে এসেছি, তা আমাদের মনে থাকে না। ফেসবুক মেমোরি আমাদের সেই দীর্ঘ পথচলার এক একটি মাইলফলক চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জীবনের প্রতিটি কঠিন বা আনন্দের অধ্যায়ই কোনো না কোনোভাবে মূল্যবান ছিল। 

ফেসবুক ব্যবহারকারী হুমাইরা খানম জেরীনও পুরোনো স্মৃতি ফিরে দেখার এই প্রক্রিয়ার মধ্যে এক ধরনের মিশ্র আনন্দ খুঁজে পান। তিনি সংক্ষেপে জানান যে, মাঝেমধ্যে এই মেমোরিগুলো দেখা বেশ ভালো লাগার এক অনুভূতি তৈরি করে। পরিশেষে বলা যায়, ফেসবুক মেমোরি কেবল হাসায় বা কেবল কাঁদায়— এমন সরলীকরণ করা সম্ভব নয়। এটি মূলত মানুষকে তার নিজের অতীতের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আবেগ অনুভব করতে শেখায়। সময় তার নিজস্ব নিয়মে চলে যায়, কিন্তু এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্মৃতিগুলো কোথাও না কোথাও জমা থেকে যায় আমাদেরই এক টুকরো অদৃশ্য অতীত হিসেবে।

banner
Link copied!