দুই দশক আগে কেউ যদি বলত যে, পরিবারের সদস্য বা বন্ধুরা আপনার সারাদিনের প্রতিটি মুহূর্তের অবস্থান জানতে পারবে, তবে অধিকাংশ মানুষই একে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার চরম লঙ্ঘন হিসেবে দেখত। প্রযুক্তির এই সক্ষমতা তখন ছিল কল্পবিজ্ঞানের মতো ভয়ংকর। কিন্তু বর্তমান সময়ে স্মার্টফোনের লোকেশন শেয়ারিং ফিচার কেবল নিরাপত্তার খাতিরেই নয়, বরং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এটি এখন এক ধরনের সামাজিক পরীক্ষা।
তরুণ প্রজন্মের কাছে এখন বন্ধুদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক লোকেশন শেয়ার করা বেশ সাধারণ বিষয়। অনেকে একে নিজেদের সম্পর্কের গভীরতার মাপকাঠি হিসেবে দেখেন। যারা শেয়ার করছে না, তাদের অনেক সময় আস্থার অভাব আছে বলে মনে করা হয়। বিবিসি টেকনোলজি কলামিস্ট টমাস জার্মেইন মনে করেন, লোকেশন শেয়ারিং এখন আর কেবল পথ খুঁজে পাওয়ার বা নিরাপত্তার টুল নয়, বরং এটি সম্পর্কের খাতিরে করা এক অদ্ভুত বাধ্যবাধকতা।গোপনীয়তা রক্ষার চেয়ে সংযোগ বজায় রাখাকে এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
স্মার্টফোন ব্যবহারের অভ্যাসে এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন কৌশল। অ্যাপল, গুগল বা মেটার মতো কোম্পানিগুলো যখন ‘ফাইন্ড মাই ফ্রেন্ডস’ বা ‘স্ন্যাপ ম্যাপ’-এর মতো ফিচার নিয়ে এল, তখন এর উদ্দেশ্য ছিল নিরাপত্তা। কিন্তু তরুণরা একে ব্যবহার করা শুরু করল সোশ্যাল নেটওয়ার্কিংয়ের নতুন মাধ্যম হিসেবে। ফলে, নিরাপত্তা টুলটি ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন রুটিনের অংশ হয়ে উঠল।সামাজিক চাপে অনেকে লোকেশন অন রাখতে বাধ্য হন।
বিশ্লেষকদের মতে, সারাক্ষণ লোকেশন শেয়ারিংয়ের ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ‘ডিজিটাল তদারকি’ তৈরি হচ্ছে। কেউ কোথাও গেল কি না, কার সঙ্গে দেখা করল—এই তথ্যগুলো যখন বন্ধুদের বা পরিবারের হাতের মুঠোয় থাকে, তখন ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়। আপনি কোথায় আছেন, তা না জানালে অনেক সময় ছোটখাটো ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষার বিষয়টি এখন আর কেবল হ্যাকার বা ডেটা চুরি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই। বরং এটি এখন বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধুত্বের শর্ত হিসেবে দাঁড়িয়েছে। প্রযুক্তির এই অতি-সংযোগ বা হাইপার-কানেক্টিভিটি একদিকে যেমন দূরত্ব কমিয়ে দিয়েছে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত পরিসরকে সংকুচিত করছে। আমরা এখন জেনে-বুঝেই নিজেদের ডিজিটাল শিকলে আবদ্ধ করছি।
