সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

কোশ্চেন টাইমে উইনস্টন চার্চিলের কাল্পনিক এআই রূপ নিয়ে বিতর্ক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ০২:১৩ পিএম

কোশ্চেন টাইমে উইনস্টন চার্চিলের কাল্পনিক এআই রূপ নিয়ে বিতর্ক

যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসির জনপ্রিয় রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কবিষয়ক ফ্ল্যাগশিপ অনুষ্ঠান কোশ্চেন টাইম এবার এক নজিরবিহীন ও চমকপ্রদ ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয়েছে। চলতি সপ্তাহের বিশেষ এই পর্বে প্যানেল আলোচক হিসেবে স্টুডিওর পর্দায় হাজির করা হয়েছিল এমন চারজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে যারা বহু দশক আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, মেক্সিকান চিত্রশিল্পী ফ্রিদা কাহলো, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা মহাত্মা গান্ধী এবং ব্রিটিশ নারী অধিকার আন্দোলনের অগ্রদূত এমেলিন পাঙ্কহার্স্টের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দ্বারা তৈরি ডিজিটাল অবতার অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখে। এই চার মৃত আইকনের ভার্চুয়াল উপস্থিতি মূলত অনুষ্ঠানের মূল আলোচনার বিষয়বস্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাবকে দর্শকদের সামনে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করার জন্য ব্যবহার করা হয়।

টেলিভিশনের পর্দায় এই ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোর ডিজিটাল পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পরপরই স্টুডিওতে উপস্থিত বাস্তব জীবনের নীতি-নির্ধারক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকি নিয়ে এক গভীর আলোচনায় মেতে ওঠেন। এই পর্বে বাস্তব প্যানেলিস্ট হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর চিফ সেক্রেটারি ড্যারেন জোনস, শ্যাডো সেক্রেটারি অব স্টেট ফর সায়েন্স, ইনোভেশন অ্যান্ড টেকনোলজি জুলিয়া লোপেজ এবং টেক উদ্যোক্তা ও গুগল এক্স-এর সাবেক প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা মো গাওদাত। তাদের সঙ্গে আরও যোগ দেন টনি ব্লেয়ার ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল চেঞ্জের এআই বিভাগের সিনিয়র ডিরেক্টর লরা গিলবার্ট এবং লন্ডনভিত্তিক বিখ্যাত এআই ভিডিও নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিন্থেসিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ভিক্টর রিপারবেলি।

গণমাধ্যমে এই বিশেষ পর্বটি প্রচারিত হওয়ার পরপরই মৃত ব্যক্তিদের অবয়ব বাণিজ্যিক বা বিনোদনমূলক উদ্দেশ্যে এভাবে ব্যবহার করা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র নৈতিক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের কোরিয়ান স্টাডিজ বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ডক্টর সারাহ সন এই ধরনের প্রযুক্তির প্রসার নিয়ে সাধারণ উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান যে ঐতিহাসিক সংবেদনশীল বিষয় বা অমীমাংসিত ইতিহাসকে বিনোদনে রূপান্তর করার এই প্রবণতা অত্যন্ত বিতর্কিত হতে পারে। অনেক সমালোচক দাবি করেছেন যে একজন মৃত মানুষের কণ্ঠস্বর এবং মুখের অবয়ব তাদের অনুপস্থিতিতে এভাবে পুনর্নির্মাণ করা তাদের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও ঐতিহাসিক সত্যতাকে ক্ষুণ্ন করে। তবে প্রযুক্তির সমর্থকদের মতে, জটিল এবং ভবিষ্যৎমুখী একটি প্রযুক্তিগত বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সৃজনশীল প্রদর্শন ছিল।

স্টুডিওর ভেতরের রাজনৈতিক বিতর্কে ড্যারেন জোনস এবং জুলিয়া লোপেজ ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণের আইনি কাঠামো নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বিমত পোষণ করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এআই অ্যাক্ট এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা সম্মেলনগুলোর পর এখন প্রতিটি দেশের ওপরই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের চাপ বাড়ছে। প্যানেলিস্টরা একমত হন যে ডিপফেক বা নকল অবয়ব তৈরি, কপিরাইট লঙ্ঘন এবং স্বয়ংক্রিয় ভুল তথ্যের বিস্তার বর্তমান গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরাসরি হুমকি স্বরূপ। বিশেষ করে যেখানে মৃত মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বা লাইকনেস রাইট সুরক্ষার জন্য এখনো সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আইন তৈরি হয়নি, সেখানে এই ধরনের উন্মুক্ত প্রদর্শন আইনি জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

সিন্থেসিয়ার প্রধান নির্বাহী ভিক্টর রিপারবেলি তার বক্তব্যে এই সিন্থেটিক মিডিয়ার প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে রক্ষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেন। তিনি দাবি করেন যে যথাযথ নিয়মতান্ত্রিক সম্মতি এবং স্পষ্ট ডিসক্লেইমার বা সতর্কবার্তা ব্যবহার করে তৈরি করা এআই অবতারগুলো শিক্ষা এবং যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। অন্যদিকে গুগল এক্স-এর সাবেক কর্মকর্তা মো গাওদাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার নিয়ে তার দীর্ঘদিনের সতর্কবার্তা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি মনে করেন যে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া অতি-বুদ্ধিমান এআই-এর বিকাশ মানব সভ্যতার অস্তিত্বের জন্য সংকট তৈরি করতে পারে। এই বিতর্কের শেষ অনুচ্ছেদে একটি বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বস্তুগত বাস্তবতার সাথে ডিজিটাল সিমুলেশনের মধ্যকার রেখাটি স্থায়ীভাবে মুছে যাচ্ছে, যা আগামী দিনে টেলিভিশন প্রযোজনা থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংলাপের পুরো সংস্কৃতিকেই বদলে দেবে।

banner
Link copied!