প্রযুক্তি বিশ্বে কম্পিউটার বাগ বা বাগ শব্দটি অত্যন্ত পরিচিত। কম্পিউটার বা সফটওয়্যারে কোনো ত্রুটি দেখা দিলেই আমরা একে বাগ বলে থাকি। অনেকের ধারণা এটি হয়তো কোনো জটিল ডিজিটাল ত্রুটি বা কোডিংয়ের ভুল থেকে এসেছে। তবে সত্য ঘটনাটি বেশ চমকপ্রদ। এই শব্দের উৎপত্তির পেছনে কোনো সফটওয়্যার কোড নয় বরং জড়িয়ে আছে একটি বাস্তব পোকা এবং একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। প্রায় আট দশক আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনার সূত্র ধরেই প্রযুক্তি বিশ্বে এই বিশেষ পরিভাষাটির ব্যবহার শুরু হয়।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন মার্ক ২ নামক একটি বিশাল আকৃতির কম্পিউটার নিয়ে কাজ চলছিল। তৎকালীন সময়ের কম্পিউটারগুলো আজকের মতো পোর্টেবল ছিল না। সেগুলোর আকার ছিল বিশাল এবং অসংখ্য যান্ত্রিক রিলে ও তারের জটিল বিন্যাসে তৈরি হতো এই যন্ত্র। কাজ করার সময় হঠাৎ করেই কম্পিউটারটি সঠিকভাবে কাজ করা বন্ধ করে দেয় এবং সিস্টেমে বারবার ত্রুটি দেখাতে থাকে। প্রোগ্রামাররা দীর্ঘক্ষণ চেষ্টা করেও ত্রুটির কোনো সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে পুরো প্রকৌশলী দল মিলে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যারের প্রতিটি অংশ পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন।
তদন্তের এক পর্যায়ে প্রকৌশলীরা অবাক হয়ে দেখতে পান কম্পিউটারের একটি যান্ত্রিক রিলের ভেতরে একটি মথ বা পোকা আটকে আছে। পোকাটি রিলের ভেতর ঢুকে পড়ার কারণে শর্ট সার্কিট তৈরি হয়েছিল এবং পুরো সিস্টেমের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছিল। বিখ্যাত কম্পিউটার বিজ্ঞানী গ্রেস হপার সেই সময় সেখানে কর্মরত ছিলেন। তার সহকর্মীরা যখন যন্ত্রের ভেতর থেকে মৃত পোকাটিকে উদ্ধার করেন তখন তিনি সেটি নিয়ে তার কাজের লগবুক বা ডায়েরিতে স্কচটেপ দিয়ে আটকে রাখেন। সেই ডায়েরির পাতায় তিনি লিখেছিলেন এটিই প্রথম কোনো বাগ বা পোকা খুঁজে পাওয়ার ঘটনা। আমেরিকার ন্যাশনাল মিউজিয়াম অফ আমেরিকান হিস্ট্রি-তে এই ঐতিহাসিক লগবুকটি আজও সংরক্ষিত আছে।
কম্পিউটারের ভেতর থেকে পোকাটিকে বের করে নেওয়ার পর যন্ত্রটি আবার স্বাভাবিকভাবে কাজ শুরু করে। একটি পোকা বা বাগ দূর করে কম্পিউটারকে সচল করার এই ঘটনা থেকেই পরবর্তীতে প্রযুক্তি বিশ্বে নতুন দুটি শব্দের পরিচিতি পায়। কম্পিউটার বা সফটওয়্যারের যেকোনো ত্রুটিকে বলা হতে থাকে বাগ এবং সেই ত্রুটি খুঁজে বের করে তা সমাধান করার প্রক্রিয়াটিকে বলা শুরু হয় ডিবাগিং। বর্তমানের অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যুগেও বিশ্বজুড়ে প্রোগ্রামার ও ডেভেলপাররা এই শব্দ দুটিকেই তাদের পেশাগত ভাষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। প্রযুক্তির ইতিহাসের সেই মথটি আজও মনে করিয়ে দেয় যে অনেক সময় বড় বড় সমস্যার সমাধান খুব ছোট কোনো বিষয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
