আহমেদাবাদ থেকে লন্ডনগামী এয়ার ইন্ডিয়ার এআই১৭১ ফ্লাইটটি আকাশ থেকে ভেঙে পড়ার পর এক বছর পার হয়ে গেছে। গত বছরের জুনে উড্ডয়নের এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে মাত্র একজন অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন। একই সঙ্গে মাটিতে থাকা আরও ১৯ জন মানুষ এই ঘটনায় প্রাণ হারান। দীর্ঘ একটি বছর ধরে নিহতদের পরিবারগুলো এখনো বেশ কিছু অনুত্তরিত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন যে সেদিন ককপিটে আসলে কী ঘটেছিল বা যান্ত্রিক ত্রুটি নাকি মানুষের ভুলেই এই বিপর্যয়। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তদন্তকারীরা এই দুর্ঘটনার চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।মুম্বাইয়ের বাসিন্দা ইমতিয়াজ আলীর পরিবার এই ট্র্যাজেডিতে তাদের চার সদস্যকে হারিয়েছে।
ইমতিয়াজের ভাই জাভেদ, ভাইয়ের স্ত্রী মরিয়ম এবং তাদের দুই সন্তান এই বিমান ক্র্যাশে মারা যান। জাভেদ দীর্ঘ বছর ধরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও প্রায়ই মুম্বাইয়ে তাদের মায়ের কাছে ফিরে আসতেন। গত বছরও দুর্ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগে তারা সবাই একসঙ্গে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করেছিলেন। ইমতিয়াজ জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে তাদের পুরো বাড়িটি কেমন যেন বদলে গেছে এবং সব সময় মনে হয় জাভেদ এখনো ঘরের চারপাশেই কোথাও আছে। তাদের হার্টের রোগী বৃদ্ধ মা ফরিদা বানুও দিন-রাত এই একই রকম এক অদৃশ্য উপস্থিতির কথা অনুভব করেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক দিন তাদের অসুস্থ মায়ের কাছে এই নির্মম সত্যটি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মকর্তা ও চিকিৎসকদের পরামর্শে প্রথমে তাকে বলা হয়েছিল যে মরিয়ম এবং শিশুরা সামান্য আহত হয়েছে। কিন্তু দুই দিন ধরে প্রিয় ছেলের কোনো ফোন না পেয়ে মা নিজেই এক অস্বাভাবিক নীরবতা ও বিপদের আভাস পেয়েছিলেন। পরে আত্মীয়-স্বজনরা তাকে এক অসুস্থ আত্মীয়কে দেখার কথা বলে আহমেদাবাদে নিয়ে যান এবং সেখানে একটি হোটেল রুমে তাকে জাভেদের মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়।
এই পরিবারটি মূলত প্রবাসী জীবন এবং ত্যাগের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল। অল্প বয়সেই বাবা মারা যাওয়ার পর দাদির কাছে মুম্বাইয়ে বড় হয়েছিলেন জাভেদ ও ইমতিয়াজ, আর তাদের মা দীর্ঘ বছর দুবাইতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন। জাভেদ পরবর্তীতে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার খোঁজে যুক্তরাজ্যে চলে যান, তবে দেশের পরিবারের সঙ্গে তার মানসিক টান কখনো কমেনি। ইমতিয়াজ স্মৃতিচারণ করে বলেন যে সারাদিন তার ভাই ও মায়ের মধ্যে ফোনে কথা হতো, আর এখন সেই শূন্যতা ও নীরবতাই তাদের মাকে ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছে।
ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রিয়জনদের মরদেহ শনাক্ত করার সেই স্তব্ধ দিনগুলোর কথা মনে করে ইমতিয়াজ জানান, প্রথম দিকে এক ধরনের ঘোর কাজ করত যে হয়তো তারা ফিরে আসবে। কিন্তু এক বছর পর এখন সেই অবিশ্বাস কেটে গেছে, কেবল রয়ে গেছে এক অন্তহীন অপেক্ষা ও অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ কী ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানতে না পারলে এই ক্ষত কোনোদিনই উপশম হবে না বলে মনে করেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।
