অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের কালান্দিয়া এলাকায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার শেষ সচল প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে সেটি দখল করে নিয়েছে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী, আল জাজিরা এবং আনাদোলু এজেন্সি নিশ্চিত করেছে। গত সোমবার সংঘটিত এই সামরিক অভিযানে ইসরায়েলের কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক সেনা ও সাঁজোয়া যান ওই চত্বরে প্রবেশ করে এবং ভেতরে থাকা কর্মীদের জোরপূর্বক বের করে দেয়। জাতিসংঘের এই সুরক্ষিত প্রতিষ্ঠানে কোনো পূর্বানুমতি ছাড়া পরিচালিত এই বেআইনি অভিযানের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক ত্রাণ ও কর্মসংস্থা বা আন্ওয়ারার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কালান্দিয়া ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারটি আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের বিশেষ কূটনৈতিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। উনিশশো বায়ান্ন সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রটি থেকে প্রতি বছর শত শত ফিলিস্তিনি তরুণ কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা লাভ করে আসছিল। এই প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি নির্দেশে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে দেশটির সরকারি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। অভিযানের সময় ক্যাম্পের আশেপাশে ফিলিস্তিনি প্রতিবাদকারীদের ওপর তাজা বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হলে গুলিতে এক ফিলিস্তিনি কিশোর আহত হয়।
গত বছর থেকেই ইসরায়েলি প্রশাসন পূর্ব জেরুজালেমসহ বিভিন্ন অঞ্চলে এই শরণার্থী সংস্থার কার্যক্রম সীমিত করার জন্য নানা ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আসছে। এর আগে সংস্থাটির বেশ কিছু স্কুল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হলেও কালান্দিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিই শহরে তাদের একমাত্র শেষ সচল প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা হিসেবে টিকে ছিল। আন্তর্জাতিক আদালতের পূর্বের নির্দেশনা ও জাতিসংঘের চার্টার লঙ্ঘন করে পরিচালিত এই দখলদারিত্বের ফলে অঞ্চলটিতে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিলিস্তিনের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রতিরোধ আন্দোলন এই জবরদখলের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর ও জোরালো পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে জাতিসংঘের কোনো স্থাপনায় সশস্ত্র বাহিনীর এই ধরনের জোরপূর্বক প্রবেশ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তিনি অবিলম্বে ইসরায়েলকে এই চত্বর ত্যাগ করার এবং দখলীকৃত সম্পত্তি জাতিসংঘের কাছে নিঃশর্তভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। এদিকে ইসরায়েলি মিউনিসিপ্যাল কর্মীরা ইতোমধ্যে দখলকৃত ওই চত্বরের ভেতরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ শুরু করেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেখানে নতুন করে ইসরায়েলি পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে এবং ওই চত্বরকে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই ধরনের পদক্ষেপে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের আইনি অধিকার ও পরিচয় মুছে ফেলার দীর্ঘমেয়াদী ইসরায়েলি পরিকল্পনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। পশ্চিম তীরের অধিকৃত অঞ্চলে নতুন বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও ইসরায়েলি সরকারের এই একরোখা নীতি মধ্যপ্রাচ্য সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথকে আরও বেশি দুরূহ করে তুলেছে। আগামী দিনে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এই বিষয়ে জরুরি আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।
