ইসলামের ইতিহাসে এমন অনেক ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাদের জীবনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল একেবারে শেষ মুহূর্তে। সাহাবী হুওয়াইতিব ইবনে আব্দুল উজ্জা (রা.) ছিলেন তেমনই একজন ভাগ্যবান ব্যক্তি। তিনি মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশ গোত্রের বনু আ-মির শাখার সন্তান। জীবনের প্রায় ৬০টি বছর কুরাইশদের প্রথাগত বিশ্বাসে কাটানোর পর মক্কা বিজয়ের ঐতিহাসিক মুহূর্তে তার হৃদয়ে ঈমানের আলো জ্বলে ওঠে। তার ইসলাম গ্রহণের গল্পটি কেবল একটি রূপান্তর নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর হেদায়েতের এক অনন্য নিদর্শন।
মক্কা বিজয়ের দিনে তিনি ছিলেন আতঙ্কিত।
সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে স্বয়ং হুওয়াইতিব (রা.) বর্ণনা করেছেন। রাসুল (সা.) যখন মক্কায় বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করলেন, তখন পুরো মক্কা নগরী ছিল এক থমথমে অবস্থায়। হুওয়াইতিব তখন ছিলেন চরম ভীতির মধ্যে। কুরাইশ নেতা হিসেবে তিনি ভাবছিলেন, তার পরিণতি কী হবে? প্রাণভয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে দেন। দিকভ্রান্তের মতো হাঁটতে হাঁটতে তিনি পৌঁছে যান আউফের বাগানে। সেখানে তার পুরনো বন্ধু আবু জার গিফারির (রা.) সঙ্গে দেখা হয়। বন্ধু হলেও আবু জার (রা.) ততদিনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাকে দেখেই হুওয়াইতিব পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু আবু জার (রা.) তাকে ডেকে থামালেন এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিলেন।
এই আশ্বাসে কিছুটা সাহস ফিরে পান হুওয়াইতিব। তিনি বন্ধুকে প্রশ্ন করলেন, কেন তিনি এতোদিন সত্য থেকে দূরে ছিলেন? আবু জার (রা.) তাকে সরাসরি রাসুল (সা.)-এর খেদমতে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। সেই সময় রাসুল (সা.) ‘বাত্বহা’ নামক স্থানে অবস্থান করছিলেন এবং তার পাশে ছিলেন হযরত আবু বকর (রা.) ও উমার (রা.)। তাদের উপস্থিতিতেই হুওয়াইতিব ইবনে আব্দুল উজ্জা (রা.) নিজের ভীতি কাটিয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন। প্রিয় নবী (সা.) তার ইসলাম গ্রহণে অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে তাকে স্বাগত জানান।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি অতীতের বিলম্বের জন্য আফসোস করেছিলেন। পরবর্তীতে মারওয়ান ইবনে হাকাম তাকে একবার প্রশ্ন করেছিলেন, কেন তিনি এত দেরিতে ইসলাম গ্রহণ করলেন? অথচ অনেক কমবয়সী মানুষ তার আগেই মুসলমান হয়ে গিয়েছিলেন। হুওয়াইতিব (রা.) দুঃখভরে বলেছিলেন, তিনি বহুবার সত্যের পথে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তৎকালীন কুরাইশ নেতাদের প্ররোচনায় বারবার পিছিয়ে গিয়েছেন। বিশেষ করে হাকামের মতো মানুষরা তাকে ধর্মের দোহাই দিয়ে বিভ্রান্ত করেছিল। আজ যখন তিনি পেছনের দিকে তাকান, তখন তার নিজের সেই সময়ের অজ্ঞতার ওপর গভীর অনুতাপ হয়।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি হুনাইন যুদ্ধ ও তায়িফ অভিযানে সাহসিকতার সঙ্গে অংশগ্রহণ করেন। রাসুল (সা.) তার ইসলামকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন এবং যুদ্ধের গনীমত থেকে তাকে ১০০ উট উপহার দিয়েছিলেন। এমনকি রাসুল (সা.) ব্যক্তিগত প্রয়োজনে তার কাছ থেকে ৪০ হাজার দিরহাম ঋণও নিয়েছিলেন, যা তাদের মধ্যকার গভীর আস্থার প্রতীক।
মুয়াবিয়া (রা.)-এর শাসনামলে ৫৪ হিজরি সনে এই মহান সাহাবী ইন্তেকাল করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১২০ বছর। হুওয়াইতিব ইবনে আব্দুল উজ্জা (রা.)-এর জীবন আমাদের শেখায় যে, সত্যকে জানার জন্য বয়সের সীমাবদ্ধতা নেই। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও যদি কারো হৃদয়ে সত্যের পিপাসা জাগে, তবে আল্লাহ তাকে সঠিক পথের দিশা দিতে পারেন।
