ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৮৯ জনে দাঁড়িয়েছে বলে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ নিশ্চিত করেছেন, বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ২,৯৮০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী কারাকাস এবং উত্তরাঞ্চলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যে ধসে পড়া শত শত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ আটকা পড়ে আছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় সময় শুক্রবার সকালে এক টেলিভিশন ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট জানান যে নিখোঁজ ও আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্ধারকারীরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে যে মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে পর পর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প ভেনিজুয়েলার উত্তরাঞ্চলে আঘাত হানে। প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭.২ এবং এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর দ্বিতীয় তথা মূল ভূমিকম্পটি ৭.৫ মাত্রায় আঘাত হানে। আবহাওয়াবিদ এবং ভূবিজ্ঞানীদের মতে, এটি ১৯০০ সালের পর ভেনিজুয়েলায় রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্পের ঘটনা। যা কম স্পষ্ট তা হলো মোট কতজন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন, তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডাটাবেজ অনুযায়ী হাজার হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পের পর থেকে দুই শতাধিক আফটারশক বা অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, যা উদ্ধার অভিযানকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
উপকূলীয় লা গুয়াইরা রাজ্যের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। ওই অঞ্চলের একটি প্রধান হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক বিবিসি নিউজকে বলেছেন যে রাজ্যের প্রধান দুটি হাসপাতাল আহতদের চাপে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং চিকিৎসকেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। কারাকাসকে সংযোগকারী প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এর ফলে বাইরে থেকে আসা জরুরি ত্রাণ ও উদ্ধারকারী দলের পৌঁছানোর প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দলগুলো ইতিমধ্যেই ভেনিজুয়েলায় পৌঁছে উদ্ধার অভিযানে যোগ দিতে শুরু করেছে। সুইজারল্যান্ড থেকে আসা ৮০ জন অভিজ্ঞ উদ্ধারকর্মী এবং মেক্সিকোর একটি বিশেষ সাহায্যকারী দল ধসে পড়া ভবনগুলোর নিচে জীবিতদের সন্ধান চালাচ্ছে। ধসে পড়া বহুতল ভবনগুলোর নিচ থেকে এখনো অনেক মানুষের বাঁচার আকুতি শোনা যাচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। সম্প্রতি লা গুয়াইরা রাজ্যে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে এক নারীকে জীবিত উদ্ধার করার দৃশ্য স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতির অভাব এবং অবিন্যস্ত ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী সংস্থা জানিয়েছে যে বিশ্বের অন্তত ১৭টি দেশ থেকে জরুরি উদ্ধারকারী দল ভেনিজুয়েলার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সহায়তা হিসেবে ১৫ কোটি ডলার মূল্যের একটি তহবিল ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সংস্থার মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এই দুর্যোগ মোকাবেলায় ভারত, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং কলম্বিয়া তাদের নিজস্ব সামরিক ও বেসামরিক উদ্ধারকারী দল এবং ফিল্ড হাসপাতাল পাঠিয়েছে। কিউবা এবং চীনও ভেনিজুয়েলার এই সংকটে পাশে থাকার এবং পুনর্গঠনে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প দুর্যোগের ভয়াবহতা বিবেচনা করে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি রাখা হয়েছে।
