যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান বিধ্বংসী যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত পাঠ্য প্রস্তুত হয়েছে বলে শুক্রবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ নিশ্চিত করেছেন, যা রয়টার্স এবং বিবিসি নিউজ প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটির নিবিড় মধ্যস্থতায় দুই বৈরী দেশের মধ্যে দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস ধরে চলা এই ভয়াবহ সংঘাতের অবসান ঘটতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাগচিও দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এই চুক্তির অগ্রগতি নিশ্চিত করে বলেছেন যে ওয়াশিংটনের সাথে একটি যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। এই ঐতিহাসিক চুক্তির প্রাথমিক শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে অবরুদ্ধ কৌশলগত হরমুজ প্রণালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা এবং ইরানের বাণিজ্যিক বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে নেওয়া।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে এই নতুন রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়েছিল। এর জবাবে ইরানও ইসরায়েল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মোদায়েন করা মার্কিন মিত্র দেশগুলোর সামরিক ঘাঁটির ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাcy চালায়। এই সংঘাতের সরাসরি ফল হিসেবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের অন্যতম প্রধান সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে তীব্র ধাক্কা দিয়েছিল। গত এপ্রিল মাসে উভয় পক্ষ একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর এবং চলতি সপ্তাহেও দুই পক্ষের মধ্যে বেশ কয়েক দফা তীব্র পাল্টাপাল্টি বিমান ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে জানান যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের আলোচকরা একটি চমৎকার মীমাংসায় পৌঁছাতে সক্ষম হওয়ায় তিনি ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত কয়েকটি নতুন সামরিক হামলা বাতিল করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তবে এই শান্তি প্রক্রিয়াটি নিয়ে ওয়াশিংটন এবং তেহরানের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈপরীত্য ও বিভ্রান্তি দেখা গেছে। শুক্রবার ইরানের স্থানীয় গণমাধ্যমে চুক্তির একটি ১৪ দফার খসড়া বিবরণী প্রকাশিত হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং লিখিত শর্তাবলীর সাথে অসংগতিপূর্ণ বলে উড়িয়ে দেন। একই দিনে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে যে হরমুজ প্রণালী অভিমুখী বেশ কয়েকটি ইরানি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে, যা আলোচনার টেবিলে এক ধরনের সামরিক চাপ বজায় রাখার ইঙ্গিত দেয়। আরাগচি পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে স্বীকার করেন যে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে এই চুক্তির কিছু শর্তাবলী নিয়ে এখনো গভীর মতভেদ রয়েছে এবং কোনো সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। যা কম স্পষ্ট তা হলো, এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য ফ্রন্ট, বিশেষ করে লেবানন ও গাজায় চলমান প্রক্সি যুদ্ধের ওপর ঠিক কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়বে। ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য দাবি করেছেন যে এই সমঝোতার আওতায় লেবাননও অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ইসরায়েলকে তার দখলকৃত সম্মুখ সামরিক অবস্থানগুলো থেকে পিছু হঠতে বাধ্য করা হবে।
চুক্তির অর্থনৈতিক সুবিধা এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের শর্তাবলীর ক্ষেত্রে মার্কিন কর্মকর্তারা অত্যন্ত কঠোর ও শর্তযুক্ত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে চুক্তি স্বাক্ষরের সাথে সাথেই ইরানকে অবরুদ্ধ থাকা কোনো অর্থ বা ফ্রোজেন অ্যাসেট ফিরিয়ে দেওয়া হবে না, বরং এটি হবে একটি সম্পূর্ণ কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক বা পারফরম্যান্স-ভিত্তিক চুক্তি। হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করা এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে কার্যকর হওয়ার পর পরবর্তী ৬০ দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি এবং পারমাণবিক স্থাপনাগুলো নিয়ে দ্বিতীয় ধাপের অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল আলোচনা শুরু হবে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই চুক্তির চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো ইরানের উৎপাদিত সমস্ত উচ্চ মাত্রার সমৃদ্ধ পারমাণবিক উপাদান সম্পূর্ণ ধ্বংস করা অথবা দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া। ইরান অবশ্য নিজের ভূখণ্ডেই এই ইউরেনিয়াম পাতলা করার ব্যাপারে জেদ ধরেছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবলই শান্তিপূর্ণ গবেষণার জন্য বলে দাবি করে আসছে। এই দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধান এখন উভয় দেশের চূড়ান্ত অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।
