মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

স্টারমার মন্ত্রিসভায় ভাঙন: খাদের কিনারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ১০:২৩ এএম

স্টারমার মন্ত্রিসভায় ভাঙন: খাদের কিনারে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

লন্ডনের ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে এখন এক অস্থির সময় পার করছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমার। তার মন্ত্রিসভা এখন এমন এক মৌলিক রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি যা যেকোনো সরকারের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রশ্নটি হলো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে স্টারমার আর কতদিন দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বা তার আদৌ থাকা উচিত কি না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই মুহূর্তে স্টারমারের শীর্ষ মন্ত্রীরা দুটি স্পষ্ট শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একটি পক্ষ তাকে সরাসরি সমর্থন দিচ্ছে এবং অন্য পক্ষটি তাকে পদত্যাগের জন্য সময়সীমা নির্ধারণের তাগিদ দিচ্ছে। মন্ত্রিসভার এই প্রকাশ্য বিভক্তি যেকোনো আধুনিক সরকারের জন্য একটি টেকসই পরিস্থিতি নয় এবং এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত নাটকীয়।

মঙ্গলবার সকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকটি স্টারমারের রাজনৈতিক জীবনের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা হতে চলেছে। এর আগে সোমবার রাতে একাধিক মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করেন। সেখানে তাকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কোনো কোনো মন্ত্রী তাকে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আবার কেউ কেউ পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে দ্রুত একটি প্রস্থান পরিকল্পনা বা টাইমটেবিল ঘোষণার অনুরোধ জানিয়েছেন। স্টারমার যখন তার সামনে থাকা বিকল্পগুলো নিয়ে ভাবছিলেন তখন তার নিজের দলের অর্থাৎ লেবার পার্টির এমপিদের মধ্যে বিদ্রোহের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দেয়। একের পর এক এমপি প্রকাশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ওপর অনাস্থা প্রকাশ করতে শুরু করেন যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত।

সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতার পর থেকেই মূলত এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ওই বক্তৃতায় স্টারমার তার দলের ও দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু বাস্তবে তা হিতে বিপরীত হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন লেবার এমপি প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে তার নেতৃত্বকে অকার্যকর বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে ব্রিটেনের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে স্টারমার সাধারণ ভোটারদের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। বিশেষ করে রিফর্ম ইউকে-র মতো রাজনৈতিক দলের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার মুখে লেবার পার্টি কীভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখবে তা নিয়ে দলের ভেতরে গভীর উদ্বেগ কাজ করছে।

তবে স্টারমারের অনুগত শিবির এখনো হাল ছাড়তে রাজি নয়। তাদের যুক্তি হলো ব্রিটেনের এই টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থায় নেতৃত্বের পরিবর্তন হিতে বিপরীত হতে পারে। ইরানের পরিস্থিতির কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও অর্থনীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে তা সামাল দেওয়ার জন্য সরকারের স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জানিয়েছেন স্টারমার নিজে এখনো ক্ষমতা ছাড়ার বিষয়ে কোনো ইতিবাচক ইঙ্গিত দেননি। তিনি মনে করেন দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্ব নির্বাচন প্রক্রিয়ার ফলে দল এবং দেশ উভয়ই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে। উপরন্তু তার উত্তরসূরি কে হবেন এবং তিনি জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া কতটুকু শক্তিশালী হবেন তা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।

বর্তমানে ডাউনিং স্ট্রিটের যে দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে তাকে বিশ্লেষকরা অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া একটি চিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ এক মিত্রও স্বীকার করেছেন যে পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। লেবার মুভমেন্টের ভেতর থেকেই এখন তিক্ততা ও পারস্পরিক দোষারোপের পালা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সম্ভাব্য নেতৃত্বের শিবির একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে যা দলের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে পুরোপুরি নষ্ট করে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবার সকালের মন্ত্রিসভার বৈঠকটি কোনো সাধারণ আলোচনা ছিল না বরং এটি ছিল স্টারমারের টিকে থাকার চূড়ান্ত লড়াইয়ের সূচনা।

ব্রিটেনের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে দেশটির অবস্থান। ব্রিটিশ মুদ্রাবাজার বা গিল্ট মুভমেন্টের অস্থিরতা স্টারমার সরকারের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন এক সময় এই বিদ্রোহ দেখা দিল যখন স্টারমারকে একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ দলীয় বিভক্তি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এই ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর হাতে খুব বেশি সময় থাকে না। যদি না তিনি খুব দ্রুত তার মন্ত্রিসভাকে একতাবদ্ধ করতে পারেন অথবা তার বিরোধীদের শান্ত করার মতো কোনো জাদুকরী সমাধান বের করতে পারেন।

বিবিসির পলিটিক্যাল এডিটর ক্রিস মেসনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন একটি সুতোর ওপর ঝুলছে। দলের ভেতরে যে পরিমাণ ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তা নিছক মন্ত্রিসভা রদবদল করে থামানো সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। মন্ত্রীরা যখন প্রকাশ্যে সময়সীমা দাবি করতে শুরু করেন তখন বুঝতে হবে যে প্রশাসনের ওপর থেকে প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে পড়েছে। এই অস্থিরতা যদি কয়েক দিন স্থায়ী হয় তবে লেবার পার্টির জন্য পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বড় ধরনের মাশুল গুণতে হতে পারে। এখন সবার নজর ডাউনিং স্ট্রিটের সেই রুদ্ধদ্বার বৈঠকগুলোর দিকে যেখান থেকে ব্রিটেনের আগামীর নেতৃত্বের ভাগ্য নির্ধারিত হবে।

স্টারমারের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে। প্রথমত তাকে মন্ত্রিসভায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে বিদ্রোহ দমন করতে হবে অথবা সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে হবে। তবে ইতিহাস বলে ব্রিটিশ রাজনীতিতে একবার যখন দলের ভেতরে নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দানা বাঁধে তখন তা খুব কমই ব্যর্থ হয়। মার্গারেট থ্যাচার থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ের বরিস জনসন বা লিজ ট্রাস সবার ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগ বা অনাস্থাই শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটিয়েছে। স্টারমার কি সেই একই পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন নাকি তিনি ইতিহাসের ধারা পাল্টে টিকে থাকবেন তা সময়ই বলে দেবে।

লেবার পার্টির ভেতরে এখন অস্থিরতা শুধু শীর্ষ পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মধ্যেও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। রিফর্ম ইউকে যে ধরনের উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে তার মোকাবিলায় স্টারমারের মধ্যপন্থী নীতি কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে বিতর্ক এখন তুঙ্গে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে দলের ভেতরের ভিন্নমত। সব মিলিয়ে স্যার কেয়ার স্টারমারের সরকার এখন তার মেয়াদের সবচেয়ে বড় অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মঙ্গলবারের পর ডাউনিং স্ট্রিট থেকে যে খবরই আসুক না কেন তা ব্রিটেনের রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

banner
Link copied!