মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

ট্রাম্প-শি সম্মেলন: বেইজিংয়ে কি ইরান যুদ্ধের সমাধান হবে?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ১০:৩৪ এএম

ট্রাম্প-শি সম্মেলন: বেইজিংয়ে কি ইরান যুদ্ধের সমাধান হবে?

বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক তিয়ানানমেন স্কয়ারে গত কয়েক দিন ধরে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা চোখে পড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে নানা জল্পনা-কল্পনা—হয়তো কোনো বর্ণাঢ্য সামরিক প্যারেড বা বড় কোনো চমক দিতে যাচ্ছে চীন। তবে এই প্রস্তুতির মূল লক্ষ্য এখন আর গোপন নেই। দীর্ঘ ৯ বছর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে কেন্দ্র করেই বেইজিংয়ে রাজকীয় আয়োজন চলছে। টেম্পল অফ হেভেনের মতো ঐতিহাসিক স্থানে আপ্যায়ন থেকে শুরু করে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা—সবই যেন একটি বার্তা দিচ্ছে: বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই নেতা এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন, যার ওপর নির্ভর করছে আগামী কয়েক দশকের বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ভাগ্য। ২০২৬ সালের এই মে মাসটি আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাস হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে।

২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। ‍‍`অপারেশন এপিক ফিউরি‍‍`র মাধ্যমে যে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, তা এখন তৃতীয় মাসে পদার্পণ করেছে। যদিও এপ্রিলে একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা এখনো তুঙ্গে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান মেয়াদের প্রথম দিকে ঘরোয়া রাজনীতি এবং সামরিক অভিযানে মনোযোগ থাকলেও, এখন তার প্রধান ফোকাস বেইজিংয়ের দিকে। এই শীর্ষ বৈঠকটি শুধু দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আগুন নেভানোর একটি শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্প ও শি জিনপিং—উভয় নেতাই চাইছেন এই সফর থেকে একটি টেকসই ফল বের করে আনতে।

চীনের জন্য এই যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। যদিও তাত্ত্বিকভাবে তারা এই যুদ্ধকে পশ্চিমা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখে খুশি হতে পারত, কিন্তু বাস্তব অর্থনৈতিক চিত্রটি ভিন্ন। গত কয়েক মাসে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ফলে চীনা ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে উৎপাদন খরচ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে পেট্রোকেমিক্যাল, প্লাস্টিক এবং টেক্সটাইল শিল্পে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। চীনা অর্থনীতির মন্থর গতির মধ্যে এই যুদ্ধ তাদের রপ্তানি নির্ভর বাজারকে আরও ঝুঁকিতে ফেলেছে। ফলে বেইজিং এখন মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে মরিয়া। পাকিস্তানের সাথে মিলে চীন একটি পাঁচ দফার শান্তি প্রস্তাব (ফাইভ-পয়েন্ট ইনিশিয়েটিভ) দিয়েছে, যা মূলত হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং শত্রুতা স্থায়ীভাবে অবসানের ওপর গুরুত্বারোপ করে।

সম্মেলনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির বেইজিং সফর একটি সুদূরপ্রসারী সংকেত ছিল। আরাগচি বেইজিংকে ‍‍`সৎ বন্ধু‍‍` হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন এবং ইরানের স্বার্থ রক্ষায় চীনের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন চাইছে চীন যেন ইরানের ওপর তাদের প্রভাব খাটিয়ে তেহরানকে আলোচনার টেবিলে স্থিতিশীল রাখে। বিনিময়ে চীন মার্কিন বাণিজ্য শুল্ক এবং উন্নত প্রযুক্তির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি তুলতে পারে। ট্রাম্প এর আগে ২০১৫ সালের পর প্রথমবার চীনা আমদানির ওপর শুল্ক ১০ শতাংশ কমানোর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তবে চূড়ান্ত ফয়সালা হবে এই বেইজিং সম্মেলনেই। বাণিজ্য যুদ্ধ এবং সামরিক যুদ্ধের এই একীভূত সমীকরণ ট্রাম্প ও শি-র ব্যক্তিগত সম্পর্কের রসায়নকেও পরীক্ষা করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিং এখন নিজেকে একজন ‍‍`বৈশ্বিক শান্তি রক্ষক‍‍` হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পাচ্ছেন। যদি তিনি ইরানকে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে রাজি করাতে পারেন, তবে তা হবে চীনের কূটনীতির এক বিশাল বিজয়। তবে ট্রাম্পের নীতি বরাবরই অনিশ্চিত। তিনি যেমন বড় ছাড় দিতে পারেন, তেমনি আলোচনার টেবিল ছেড়ে উঠে আসার ইতিহাসও তার আছে। তবে ২০২৬ সালের বিশ্ব পরিস্থিতি ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। তাইওয়ানের ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা এবং এআই প্রযুক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এই সম্মেলনের মূল অ্যাজেন্ডা থেকে হারিয়ে যায়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যের সংকট এই ইস্যুগুলোকে আলোচনার টেবিলে একটি ‍‍`গ্র্যান্ড বারগেন‍‍` বা বড় চুক্তির অনুষঙ্গ করে তুলেছে।

বিবিসির উত্তর আমেরিকা ও চীন প্রতিনিধিদের মতে, এই সম্মেলন যদি সফল হয়, তবে তা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক নতুন বসন্ত বয়ে আনবে। অন্যদিকে ব্যর্থতা মানেই হলো সংঘাতের এক দীর্ঘস্থায়ী চক্রে প্রবেশ করা। ট্রাম্পের ‍‍`আমেরিকা ফার্স্ট‍‍` এবং শি-র ‍‍`চীনা স্বপ্ন‍‍` এখন একে অপরের পরিপূরক হতে পারে শুধু যদি তারা উভয়েই বুঝতে পারেন যে একটি অস্থির বিশ্ব কারো জন্যই লাভজনক নয়। টেম্পল অফ হেভেনের যে প্রাঙ্গণে একসময় সম্রাটরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন, সেখানে আজ ট্রাম্প ও শি জিনপিং কি বিশ্ব শান্তির কোনো ফসল ফলাতে পারবেন? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে সারা বিশ্ব। বেইজিংয়ের রাজকীয় ভোজ শেষে যখন দুই নেতা বিদায় নেবেন, তখনই পরিষ্কার হবে ২০২৬ সালের পরবর্তী সময়টা যুদ্ধের হবে নাকি সমৃদ্ধির।

banner
Link copied!