লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে যা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্বকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। মঙ্গলবারের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই ডাউনিং স্ট্রিটে শুরু হয়েছে টানটান উত্তেজনা। মন্ত্রিসভার শীর্ষ পর্যায়ের মন্ত্রীরা এখন প্রকাশ্যে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদিকে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অনুগতরা আর অন্যদিকে একটি শক্তিশালী পক্ষ যারা অবিলম্বে স্টারমারকে তার পদত্যাগের একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণার তাগিদ দিচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং আরও বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এখন প্রধানমন্ত্রীর ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন যেন তিনি ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা স্পষ্ট করেন। যদিও ডাউনিং স্ট্রিট সূত্র বলছে শাবানা মাহমুদ মন্ত্রিসভায় আপাতত সংখ্যালঘুদের দলে রয়েছেন তবে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে।
গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয়কর ফলাফলই এই আগ্নেয়গিরির বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। নির্বাচনে লেবার পার্টি প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাউন্সিলর পদ হারিয়েছে যা দলটির জন্য গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে রিফর্ম ইউকে এবং গ্রিন পার্টির উত্থান লেবার পার্টির ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ধস নামিয়েছে। ওয়েলসে দীর্ঘ এক শতাব্দীর রাজনৈতিক আধিপত্য হারিয়েছে লেবার পার্টি আর স্কটিশ পার্লামেন্টে ফিরেছে মাত্র ১৭টি আসন নিয়ে। এমন ভরাডুবির পর দলের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে যে আগামী ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে স্টারমার কি আদৌ দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্য কি না। সাধারণ মানুষের আস্থা হারানোর এই চিত্রটি এখন আর শুধু গুঞ্জনের পর্যায়ে নেই বরং তা প্রকাশ্য বিদ্রোহে রূপ নিয়েছে।
সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহে এখন পর্যন্ত ৭২ জন লেবার এমপি সরাসরি যোগ দিয়েছেন। তারা সবাই একযোগে দাবি করছেন যে প্রধানমন্ত্রীকে হয় পদত্যাগ করতে হবে অথবা অবিলম্বে তার উত্তরসূরি নির্বাচনের জন্য একটি সময়সূচি দিতে হবে। এই সংকটের গভীরতা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় যে সরকারের একদম তৃণমূল পর্যায়ের ছয়জন গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় ব্যক্তিগত সচিব বা পিপিএস একযোগে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগকারীদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের সহকারী জো মরিস অন্যতম। মরিস সরাসরি বলেছেন যে প্রধানমন্ত্রী জনসাধারণের বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়েছেন। এছাড়াও ডেভিড ল্যামি ড্যারেন জোনস এবং এমা রেনল্ডসের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের সহকারীরাও একই পথে হেঁটেছেন। তাদের এই গণপদত্যাগ স্টারমারের প্রশাসনিক ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী স্টারমার এখনো তার অবস্থানে অনড় থাকার চেষ্টা করছেন। সোমবার এক বক্তৃতায় তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং যারা তাকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন তাদের তিনি ভুল প্রমাণিত করবেন। স্টারমার স্বীকার করেছেন যে সরকার কিছু ভুল করেছে তবে তার দাবি বড় বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল। তার এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বাস্তবতাবিবর্জিত বলে অভিহিত করেছেন। বিশেষ করে ব্লু লেবার ককাস বা নীল লেবার গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে জোনাথন হিন্ডার বলেছেন যে কোনো প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেই এত বড় বিদ্রোহের পর টিকে থাকা অসম্ভব। তিনি স্টারমারের সোমবারের বক্তব্যকে চরম অপমানজনক বলে বর্ণনা করেছেন কারণ সেখানে জনগণের প্রকৃত সমস্যার চেয়ে ব্রেক্সিট পরবর্তী সম্পর্কের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই রাজনৈতিক নাটকের আরেকটি বড় দিক হলো নেতৃত্বের লড়াই। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের সমর্থকরা চাইছেন স্টারমার যেন একটি সময়সীমা ঘোষণা করেন যাতে বার্নহামের মতো জনপ্রিয় নেতারা সংসদে ফেরার সুযোগ পান। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী মেয়র হিসেবে বার্নহাম সংসদ সদস্য নন আর সংসদ সদস্য না হলে কেউ লেবার পার্টির নেতা হতে পারেন না। ফলে বার্নহামের বিরোধীরা চাইছেন স্টারমার যেন দ্রুত পদত্যাগ করেন যাতে বার্নহাম প্রার্থী হওয়ার সুযোগই না পান। অন্যদিকে ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ঘনিষ্ঠরা চাইছেন স্টারমার যত দ্রুত সম্ভব বিদায় নিন যাতে তারা এখনই নেতৃত্বের দৌড়ে এগিয়ে থাকতে পারেন। এই ত্রিমুখী লড়াই লেবার পার্টিকে এক গভীর আদর্শিক ও কৌশলগত সংকটে ফেলে দিয়েছে।
এদিকে ডাউনিং স্ট্রিট থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার কিছু মরিয়া চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ স্টিল জাতীয়করণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নতুন আইন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া মানে দেশকে বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেওয়া যেমনটা কনজারভেটিভ পার্টির সময় হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো তার নিজের দলের এমপির সংখ্যা যেভাবে প্রতিদিন বিদ্রোহের দিকে ঝুঁকছে তাতে তিনি আর কতদিন এই যুক্তি দেখাতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। উত্তর লন্ডনের এমপি ক্যাথরিন ওয়েস্ট গত সপ্তাহে একটি বিদ্রোহের সূচনা করতে চেয়েছিলেন যদিও তিনি পরে পিছিয়ে এসেছেন তবে তিনি এখন সরাসরি সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে স্টারমারকে বিদায় নেওয়ার সময়সীমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
ব্রিটেনের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট স্টারমারকে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। রিফর্ম ইউকে যেভাবে শ্রমজীবী মানুষের ভোটে ভাগ বসাচ্ছে তা ঠেকাতে স্টারমার ব্যর্থ হয়েছেন বলে দলের ভেতর থেকেই তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে আজকের মন্ত্রিসভার বৈঠকটিই হয়তো স্টারমারের রাজনৈতিক ভাগ্যের চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেবে। যখন মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যরা প্রকাশ্যে সময়সীমা দাবি করেন তখন প্রথাগত ব্রিটিশ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রীর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। লন্ডনের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকলেও ডাউনিং স্ট্রিটের মেঘ হয়তো আরও অনেকদিন স্থায়ী হবে যদি না কোনো অলৌকিক উপায়ে স্টারমার তার দলের বিশ্বাস ফিরে পান।
