গত বছর ১২ জুন, ২০২৫। আহমেদাবাদের আকাশ থেকে খসে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১—একটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান। আজ সেই মর্মান্তিক ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলো। এই দুর্ঘটনায় বিমানের ২৪১ জন যাত্রী ও ক্রু এবং মাটিতে থাকা ১৯ জনসহ মোট ২৬০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আহমেদাবাদের মেখানি নগর এলাকায় হোস্টেলের ওপর আছড়ে পড়া সেই বিমানের ঘটনার এক বছর পার হয়ে গেলেও পরিবারগুলো এখনও চূড়ান্ত উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত এক বছরের মধ্যে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কথা থাকলেও, ভারতের এয়ারক্রাফট অ্যাকসিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো (AAIB) এখনও তা প্রকাশ করতে পারেনি।
দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস পর প্রকাশিত প্রাথমিক প্রতিবেদনে একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছিল। এতে বলা হয়েছিল, উড্ডয়নের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বিমানের ইঞ্জিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের একটি অডিও ট্রানস্ক্রিপ্ট থেকে জানা যায়, পাইলট ও কো-পাইলট জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া নিয়ে কথা বলছিলেন। এরপরই বিমানটি থ্রাস্ট বা ধাক্কা হারিয়ে মাটি থেকে মাত্র ৬২৫ ফুট উচ্চতায় থাকা অবস্থায় নিচে আছড়ে পড়ে। সেই অডিও ক্লিপটি নিয়ে তখন পাইলটদের আত্মহত্যার তত্ত্বটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট করা হয়নি যে, জ্বালানি সরবরাহ কি পাইলটের ভুলে বন্ধ হয়েছিল, নাকি বিমানে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা ‘সফ্টওয়্যার গ্লিচ’ ছিল।
এই বিমান দুর্ঘটনার তদন্ত বিলম্বিত হওয়ার পেছনে বেশ কিছু জটিল কারণ রয়েছে। মিডিয়া রিপোর্টে উঠে এসেছে যে, বিমানটির ইঞ্জিনগুলোর জটিল বিশ্লেষণের জন্য অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন। বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেলের ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম বড় আকারের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। তাই তদন্তকারীরা এই ঘটনাকে অত্যন্ত সংবেদনশীলভাবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক এভিয়েশন আইন অনুযায়ী, চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে দেরি হলে প্রতিটি বার্ষিকীতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিবৃতি দিতে হয়। সেই নিয়ম মেনেই ভারত সরকার শিগগিরই একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন প্রকাশের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তদন্ত বিলম্বের ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অত্যন্ত হতাশ। আহমেদাবাদের নিহতদের স্বজনরা এক বছর পার করে এসেও তাদের প্রিয়জন হারানোর কোনো সদুত্তর পাননি। তাদের অভিযোগ, কেন জ্বালানি সুইচগুলো হঠাৎ করে ‘কাট অফ’ মোডে চলে গেল, তার কোনো টেকনিক্যাল ব্যাখ্যা বা যান্ত্রিক ত্রুটির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। যারা জীবিত অবস্থায় আহত হয়েছিলেন বা প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তারা কেবল ক্ষতিপূরণ নয়, বরং দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছেন।
এয়ার ইন্ডিয়া কর্তৃপক্ষ এবং বোয়িং কোম্পানি উভয়ের জন্যই এই দুর্ঘটনাটি ছিল একটি বড় ধাক্কা। টাটা গ্রুপের অধীনে যাওয়ার পর এয়ার ইন্ডিয়া যখন তার ব্র্যান্ড ইমেজ পুনর্গঠন করছিল, তখন এই ভয়াবহ ঘটনাটি তাদের কার্যক্রমের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এখন সবার নজর সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদনের দিকে। বিশেষজ্ঞ ও তদন্তকারীরা কি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারবেন এটি মানুষের ভুল ছিল, নাকি ড্রিমলাইনারের আধুনিক প্রযুক্তির কোনো লুকানো ত্রুটি? সেই উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত এই দুর্ঘটনার রহস্য সাধারণ মানুষের মনেই থেকে যাবে।
