যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের দ্রুত স্বদেশে ফেরত পাঠাতে এক বিশাল কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। এই ‘গণ-ডিপোর্টেশন’ বা গণ-বহিষ্কার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সারা দেশজুড়ে ২৪টি নতুন ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা করছে মার্কিন স্বরাষ্ট্র দপ্তর (ডিএইচএস)। তবে সরকারের এই আক্রমণাত্মক অভিবাসন নীতি বাস্তবায়নের শুরুতেই বড় ধরনের আইনি ও সামাজিক বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যে প্রস্তাবিত দুটি কেন্দ্র নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার ১১ মে ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য সামনে এসেছে।
মার্কিন স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পরিকল্পনা অনুযায়ী, সারা দেশে ৮টি বিশাল আকারের ডিটেনশন সেন্টার এবং ১৬টি প্রসেসিং সেন্টার বা প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। পেনসিলভানিয়ার শুল্কিল (Schuylkill) ও বার্কস (Berks) কাউন্টিতে দুটি কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে যা ৩৮.৩ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল প্রকল্পের অংশ। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, এই কেন্দ্রগুলো স্থাপনের ফলে হাজার হাজার নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ ট্যাক্স বা কর জমা হবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা এবং অঙ্গরাজ্য সরকার এই যুক্তিতে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। তারা মনে করছেন, এটি জননিরাপত্তা এবং স্থানীয় সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জোশ শাপিরো ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। তিনি রাজ্য পরিবেশ সুরক্ষা দপ্তরকে (ডিইপি) নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা ডিএইচএস-এর ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে। ডিইপি দাবি করেছে যে, প্রস্তাবিত আটক কেন্দ্রগুলোকে অবশ্যই রাজ্যের পানীয় জলের গুণমান এবং পয়ঃনিষ্কাশন সংক্রান্ত পরিবেশ আইন মেনে চলতে হবে। এটি একটি নজিরবিহীন পদক্ষেপ, কারণ সাধারণত এ ধরনের প্রশাসনিক বিষয়গুলো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে থাকে। বিপরীতে ডিএইচএস এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে দাবি করেছে যে, রাজ্যের এই হস্তক্ষেপ ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় অভিবাসন আইন প্রয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বর্তমানে এই মামলাটি রাজ্য পরিবেশগত শুনানি বোর্ডের বিবেচনাধীন রয়েছে।
শুল্কিল কাউন্টির ট্রেমন্ট টাউনশিপে একটি পরিত্যক্ত গুদামঘরকে ৭,৫০০ আসনের বিশাল ডিটেনশন সেন্টারে রূপান্তর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা মাত্র ২৮৩ জন। অর্থাৎ প্রস্তাবিত কেন্দ্রে এলাকার জনসংখ্যার চেয়ে ২৬ গুণ বেশি মানুষকে আটকে রাখা হবে। স্থানীয় আয়োজক জেনিফার ডিভাইন এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করে জানিয়েছেন যে, এটি একটি অমানবিক সিদ্ধান্ত। তাঁর মতে, আটককৃত ব্যক্তিদের মানুষের পরিবর্তে পশুর মতো বিবেচনা করা হচ্ছে। জেনিফার মনে করেন যে, সরকার কৌশলগতভাবে ছোট এবং গ্রামীণ এলাকাগুলোকে বেছে নিয়েছে যাতে বড় কোনো প্রতিরোধের মুখে পড়তে না হয়।
রাজনৈতিকভাবে এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করছেন মার্কিন প্রতিনিধি ড্যান মিউজার। তিনি জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় অবকাঠামো উন্নয়নে এবং জরুরি সেবার ঘাটতি মেটাতে আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে ইচ্ছুক। শুল্কিল কাউন্টি কমিশনার ল্যারি প্যাডোরা অবশ্য স্পষ্ট করে বলেছেন যে, পর্যাপ্ত পরিকাঠামো এবং বিচার বিভাগীয় সহায়তা ছাড়া কাউন্টি এই বিশাল চাপের বোঝা বইতে পারবে না। বর্তমানে আইসিই (ICE) বা ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বিভাগ তাদের ক্ষমতা বাড়িয়ে ৯২,৬০০ অভিবাসীকে আটকে রাখার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন বিতর্ককে এক নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে যা আগামী নির্বাচনের সমীকরণকেও প্রভাবিত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
