সোমবার, ০১ জুন, ২০২৬, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

স্যাটেলাইট চিত্রে গাজা মুছে ফেলার প্রমাণ, ধ্বংসের নতুন মানচিত্র

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩১, ২০২৬, ১১:২৫ পিএম

স্যাটেলাইট চিত্রে গাজা মুছে ফেলার প্রমাণ, ধ্বংসের নতুন মানচিত্র

বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ভৌগোলিক সফটওয়্যার গুগল আর্থে সম্প্রতি যুক্ত হওয়া উচ্চ-রেজোলিউশনের নতুন স্যাটেলাইট মানচিত্রে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার, বিশেষ করে দক্ষিণ গাজার সম্পূর্ণ ভৌগোলিক অবয়ব বদলে যাওয়ার এক হাহাকারপূর্ণ বাস্তব চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ধারণ করা এই নতুন আকাশচিত্রগুলো বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে যে, গাজা উপত্যকা থেকে আক্ষরিক অর্থেই আস্ত শহর, শতাব্দী প্রাচীন কৃষি জমি, ঐতিহাসিক গ্রাম এবং পবিত্র কবরস্থানগুলো চিরতরে মুছে ফেলা হয়েছে। 

ফিলিস্তিনিদের জন্য এই মানচিত্র কেবল একটি প্রযুক্তিগত আপডেট নয়, বরং এটি তাদের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া এক পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞের এক অকাট্য বৈজ্ঞানিক দলিল, যা প্রায় ৭৩ হাজার মানুষের প্রাণের বিনিময়ে রচিত হয়েছে। মাটির ওপর নির্মিত সুউচ্চ আবাসিক ভবন থেকে শুরু করে মাটির নিচে থাকা মানুষের শেষ স্মৃতিচিহ্ন পর্যন্ত কোনো কিছুই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর এই মেগা ধ্বংসযজ্ঞের হাত থেকে রেহাই পায়নি।

ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মুহান্নাদ কিশতা তাঁর এক হৃদয়বিদারক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের মাআন এলাকায় অবস্থিত তাদের পারিবারিক ‘শেখ মোহাম্মদ’ কবরস্থানটি এখন আর কোনো মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গুগল আর্থের নতুন চিত্রে দেখা যাচ্ছে, যেখানে একসময় তাঁর দুই বোন রিম ও ওয়ালার কবরসহ হাজারো মানুষের শেষ শয্যাশায়ী ছিল, সেই পবিত্র স্থানটিকে পুরোপুরি সমতল করে সেখানে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সাঁজোয়া যান, ট্যাংক এবং অস্থায়ী সামরিক ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। 

ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটরের দেওয়া চাঞ্চল্যকর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গাজার মোট কবরস্থানগুলোর প্রায় ৯৪ শতাংশ সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের স্মৃতি ও ইতিহাসের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে সামরিক ব্যারাকে রূপান্তর করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন বর্বরতা।

মানচিত্র থেকে ভূগোল ও স্মৃতি মুছে ফেলার কৌশল

গুগল আর্থের এই বিস্তৃত এভিয়েশন ছবিগুলো প্রমাণ করে যে, গাজার প্রধান প্রধান আবাসিক কেন্দ্রগুলো এখন কেবলই ধূসর ধূলিকণায় পরিণত হয়েছে, যার ফলে উপত্যকার সীমানা চেনা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ প্রান্তের ঐতিহাসিক রাফাহ শহরে ধ্বংসের এই তীব্রতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। কাতার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক অর্থায়নে নির্মিত তাল আস-সুলতানের সুপরিচিত ‘সৌদি নেইবারহুড’ নামের ৭৫২টি আধুনিক ফ্ল্যাট সম্বলিত বিশাল আবাসন প্রকল্পটি এখন সম্পূর্ণ মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২৪ সালের শুরুতে রাফাহ আক্রমণের বিরুদ্ধে একটি তথাকথিত ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সতর্কবার্তা ঘোষণা করলেও, বাস্তবে ইসরায়েল সেই আন্তর্জাতিক চাপকে তোয়াক্কা না করেই তাদের নৃশংস সামরিক অভিযান সম্পন্ন করেছে। রাফাহর পুরো দক্ষিণাঞ্চলের শহুরে অবকাঠামো এখন এমনভাবে মুছে গেছে যে, দূর থেকে কেবল কিছু রাস্তার আবছা রেখা ছাড়া আর কোনো স্থাপনার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না।

রাফাহর দূর পশ্চিমে অবস্থিত সমুদ্র উপকূলবর্তী ঐতিহ্যবাহী ‘সুইডিশ ভিলেজ’ বা সুইডিশ গ্রামটি এখন মানচিত্র থেকে সম্পূর্ণ ভ্যানিশ হয়ে গেছে। ১৯৬৫ সালে আন্তর্জাতিক সহায়তায় ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য নির্মিত এই উপকূলীয় গ্রামটি প্রায় ১,৩০০ জেলের একটি প্রাণবন্ত বসতি ছিল। ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এই গ্রামের ডজন ডজন মাছ ধরার নৌকা, জাল মেরামতের শেড এবং সুইডিশ জনগণের উপহার হিসেবে নির্মিত একটি সুসংগঠিত কমিউনিটি সেন্টারকে পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। 

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, পুরো গ্রামের মধ্যে মাত্র পাঁচটি বাড়ি অলৌকিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং বাকি পুরো এলাকাটিকে ইসরায়েলি নৌ ও স্থল বাহিনীর একটি সুরক্ষিত সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা হয়েছে। একই পরিণতি হয়েছে ঐতিহাসিক রাফাহ সীমান্ত ক্রসিংয়ের, যা একসময় অবরুদ্ধ গাজাবাসীর জন্য বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগের একমাত্র লাইফলাইন বা জীবনরেখা ছিল। ক্রসিংটির বিশাল ভিআইপি টার্মিনাল, যাত্রী আগমন ও প্রস্থান হল এবং মানবিক সাহায্যবাহী ট্রাকের স্ক্যানিং সেন্টারগুলো ভেঙে সেখানে এখন কাঁটাতারের বেষ্টনী ও ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা ও কৃষি খাতের পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ

দক্ষিণ গাজার বানি সুহাইলা, আবসান এবং আল-জানা অঞ্চলের পূর্বদিকের কৃষিপ্রধান উপত্যকাগুলোতে ইসরায়েলি ট্যাংকগুলো বেসামরিক ঘরবাড়ির মাঝখানে স্থায়ী বাঙ্কার তৈরি করে অবস্থান নিয়েছে। যুদ্ধের আগে এই পূর্ব জেলাগুলো ছিল খান ইউনিসের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ কৃষি অঞ্চল, যেখানে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের বহুতল পারিবারিক ফ্ল্যাট ছিল। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের নিজেদের রসদ সরবরাহের রাস্তা বা মিলিটারি সাপ্লাই লাইন তৈরি করার জন্য এই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোর শত শত বাড়ি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে এখানকার বিশাল জনসংখ্যা বাস্তুচ্যুত হয়ে সমুদ্র উপকূলের আল-মাওয়াসির তপ্ত বালুচরে অথবা মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহর স্কুলগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। 

কাতার সরকারের ১৩৫ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়নে নির্মিত খান ইউনিসের বিখ্যাত ‘হামাদ সিটি’ আবাসন প্রকল্পটি এখন একটি কঙ্কালে পরিণত হয়েছে। ৫ তলা বিশিষ্ট ৫৩টি আধুনিক ভবনের প্রায় ৩,০০০ ফ্ল্যাটে যে ১৫ হাজার নিম্নবিত্ত ফিলিস্তিনি পরিবার বাস করতেন, স্যাটেলাইট চিত্রে সেই পুরো আধুনিক শহরটিকে এখন কংক্রিটের এক বিশাল পাহাড়ে পরিণত হতে দেখা গেছে।

 

জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ (UNICEF) তাদের সর্বশেষ মূল্যায়নে জানিয়েছে যে, গাজার মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ৯৭ শতাংশের বেশি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ৬ লাখ ৫৮ হাজার শিশু টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই বড় হচ্ছে। উপত্যকার উচ্চশিক্ষার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব গাজা (IUG) যেখানে ২০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতেন এবং আল-আজহার ইউনিভার্সিটি যার শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ১৬ হাজারেরও বেশি, তাদের মূল ক্যাম্পাসগুলো পরিকল্পিত নিয়ন্ত্রিত সামরিক বিস্ফোরণের মাধ্যমে ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গাজার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উচ্চশিক্ষা ও মেধা বিকাশের পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আবাসিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রাফাহ ও খান ইউনিসের যে উর্বর কৃষি জমি এবং গ্রিনহাউসগুলো একসময় গাজার ‘ফুড বাস্কেট’ বা খাদ্যের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করত, সেগুলোকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা হয়েছে। গাজার মোট চাহিদার ৪০ শতাংশের বেশি তাজা শাকসবজি, টমেটো, জলপাই এবং লেবু সরবরাহ করা হতো এই গ্রিনহাউসগুলো থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) তাদের আশঙ্কাজনক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, বর্তমানে গাজার মাত্র ৫ শতাংশেরও কম কৃষি জমি চাষাবাদের উপযোগী রয়েছে। 

শাকোশ এলাকায় ইসরায়েলি বুলডোজারগুলো সমস্ত গ্রিনহাউস গুঁড়িয়ে দিয়ে মাটির পুষ্টিকর উপরিভাগ বা টপসয়েল তুলে নিয়ে গেছে, যা এই অবরুদ্ধ অঞ্চলের মানুষকে কৃত্রিম ও মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিয়েছে। খান ইউনিসের স্থানীয় সাংবাদিক ওলা আবু মোয়ামের জানিয়েছেন যে, প্রতিদিন হাজার হাজার নারী ও শিশু খালি পাতিল হাতে লঙ্গরখানা বা স্যুপ কিচেন থেকে ক্ষুধার্ত মুখে ফিরে যাচ্ছেন, যা বিশ্ব বিবেক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতার এক জ্যান্ত প্রমাণ।

banner
Link copied!