লেবাননে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং এর ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় সহায়তার আবেদন দ্বিগুণ করেছে জাতিসংঘ। দেশটিতে গত চার মাস ধরে চলা সংঘাতের জেরে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। জাতিসংঘের মানবিক ত্রাণ সমন্বয়কারী সংস্থা ওচা শুক্রবার জানিয়েছে যে আগামী ছয় মাসের জন্য তাদের ৬৪০ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। চলতি বছরের মার্চ মাসে যখন এই অঞ্চলে সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়, তখন তারা ৩০৮ মিলিয়ন ডলারের আবেদন জানিয়েছিল।
ওচা জানিয়েছে, মার্চ মাসের আবেদনের প্রেক্ষিতে তারা এখন পর্যন্ত মাত্র ১৮৫ মিলিয়ন ডলার পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় তারা আগের লক্ষ্যের চেয়ে অতিরিক্ত ৩৩১ মিলিয়ন ডলারের চাহিদা তৈরি করেছে। ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। দেশটির দাবি, তারা লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবোল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছে। এই সংঘাতের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
লেবাননের জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৩,৫২৬ জন নিহত এবং ১০,৭৩৩ জন আহত হয়েছেন। সংঘাতের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আশ্রয়হীন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বারবার স্থান পরিবর্তন, অপর্যাপ্ত আশ্রয়স্থল এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার অনিশ্চয়তা মানুষের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। আক্রান্ত মানুষ তাদের বেঁচে থাকার শেষ সম্বলটুকুও হারিয়ে ফেলছে এবং জরুরি সেবা খাতগুলো প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে।
জাতিসংঘের আবাসিক ও মানবিক সমন্বয়কারী ইমরান রেজা বলেছেন, লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় জনগণ গত তিন মাস ধরে এক অবর্ণনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বেসামরিক নাগরিকদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। এই সংকট অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় লেবাননে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খরচ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। ওচার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে লেবাননের ৬২টি হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া সংঘাতের কবলে পড়ে এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি প্যারামেডিক বা জরুরি সেবাকর্মী নিহত হয়েছেন। শিক্ষা ব্যবস্থাও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রায় ৪৫০টি স্কুল এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার এবং শিক্ষার ক্ষতি অপূরণীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে কূটনৈতিক পর্যায়েও শান্তি প্রচেষ্টায় অচলাবস্থা কাটছে না। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে লেবানিজ ও ইসরায়েলি প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতি চুক্তির কথা শোনা গেলেও হেজবোল্লাহ তা প্রত্যাখ্যান করেছে। গোষ্ঠীটি শর্তহীন পূর্ণ যুদ্ধবিরতি এবং লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। মাঠ পর্যায়ে যখন রাজনৈতিক ও সামরিক বিতর্ক চলছে, তখন সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসা এই দুর্দশা লাঘবে আন্তর্জাতিক সহায়তাই এখন একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
