আহমেদাবাদের মেঘানি নগরের এক ছোট ঘরে বসে সীতা পাটনি যখন জানালার বাইরে দিয়ে উড়োজাহাজের গর্জন শোনেন, তখন তার চোখে জল নেমে আসে। তার ডান হাত, কোমর এবং পায়ে এখনো পোড়া দাগ লেগে আছে, যা গত বছরের ১২ জুনের সেই ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী। সেই দিনে এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট ১৭১ আহমেদাবাদের আকাশ থেকে আছড়ে পড়েছিল ঠিক তার চায়ের দোকানের পাশের হোস্টেলে। সেদিন নিজের সন্তান আকাশকে বাঁচানোর জন্য তিনি আগুনের লেলিহান শিখার দিকে ছুটে গিয়েছিলেন, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। আকাশ শব্দের অর্থ হলো আকাশ, অথচ একটি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার বিমান আকাশ থেকেই খসে পড়েছিল তার ছেলের ওপর।
২০২৫ সালের সেই দিনে আকাশ তার মায়ের চায়ের দোকানের টিনের চালের নিচে ঘুমিয়ে ছিল। সেই ছিল তার শেষ স্মৃতি। দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকারীরা তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে আকাশ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। কিন্তু ২০ দিন পর তার কাছে খবর পৌঁছায় যে ঘটনার দিনই তার সন্তান মারা গেছে। ফ্লাইট ১৭১ দুর্ঘটনায় মোট ২৫৯ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ২৪১ জন বিমানের যাত্রী এবং ১৮ জন ছিলেন মাটিতে থাকা সাধারণ মানুষ। দুর্ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজনহারা পরিবারগুলোর কাছে এই ক্ষত এখনো টাটকা।
দুর্ঘটনার মাত্র কয়েকদিন আগে সলিম প্যাটেলের পরিবারে ছিল আনন্দের জোয়ার। তার ২৫ বছর বয়সী ছেলে সাহিল যুক্তরাজ্যের ভিসা লটারিতে জয়ী হয়েছিল। এটি ছিল তার পরিবারের জন্য একটি নতুন জীবনের স্বপ্ন। কিন্তু সেই ভিসা লটারিই যেন সাহিলের জন্য মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাহিল ছিলেন সেই ফ্লাইটের যাত্রী। সলিম প্যাটেল অভিযোগ করেন, এয়ার ইন্ডিয়া ও টাটা গ্রুপের কর্মকর্তারা তাদের কাছে ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এলেও শর্ত জুড়ে দিয়েছিলেন। সাহিল আগে বেতনভুক্ত কর্মী ছিলেন কি না বা অফিসে কাজের ছবি আছে কি না—এমন সব অযৌক্তিক শর্তে তারা জর্জরিত। ন্যায়বিচারের আশায় তারা এখন মার্কিনভিত্তিক একটি ল ফার্মের সাহায্য নিয়েছেন।
লন্ডনে অবস্থানরত মুহাম্মদ শেঠওয়ালা এখন শোক ও নির্বাসন—এই দুই সংকটের মুখোমুখি। দুর্ঘটনার দিন তার স্ত্রী সাদিকা ও কন্যা ফাতিমা ভারত থেকে লন্ডনে ফিরছিলেন। স্ত্রী ও কন্যার মৃত্যু তাকে মানসিকভাবে ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। সাদিকা লন্ডনে পড়াশোনা শেষ করে এক ফার্মে কাজ করতেন। স্বামী হিসেবে শেঠওয়ালা তার ভিসার ওপর ভিত্তি করে সেখানে অবস্থান করছিলেন। সাদিকার মৃত্যুর পর যুক্তরাজ্যের অভিবাসন দপ্তর তাকে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে তিনি প্রায় ১৫ হাজার ডলার ব্যয় করেছেন। শোকের এই সময়ে সাহায্য তো দূরের কথা, এয়ার ইন্ডিয়ার কাছ থেকে কোনো ধরনের সমর্থন তিনি পাননি।
দুর্ঘটনার পর ভারতের বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেখানে মূলত পাইলটকে দায়ী করা হয়েছিল। তবে ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মনে করে, বিমানটি যান্ত্রিক ত্রুটির শিকার হয়েছিল এবং কর্তৃপক্ষ সত্য গোপন করছে।
আকাশের মা সীতা পাটনি কিংবা সলিম প্যাটেল—সবারই একই আক্ষেপ, বছরের পর বছর এমন মানবিক বিপর্যয় ঘটে কিন্তু দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয় না। আকাশের স্মৃতিতে বাড়িতে এখনো প্রদীপ জ্বালান সীতা পাটনি। তার ছেলের নাম আকাশ হলেও বিমান দুর্ঘটনাটি তার পুরো পৃথিবীটাকে অন্ধকার করে দিয়েছে। এয়ার ইন্ডিয়া ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোর ক্ষোভ ও দাবির বিষয়ে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্পষ্ট সমাধান দেয়নি। বিমানবন্দর সংলগ্ন এই এলাকায় এখন উড়োজাহাজ দেখলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এলাকাবাসীর মধ্যে। আকাশ ও সাহিলের মতো শত শত তরুণের স্বপ্ন যেভাবে ধূলিসাৎ হয়েছে, তা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং এক একটি পরিবারের বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প। আকাশ থেকে ঝরে পড়া লোহার সেই দানব তাদের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে অগণিত স্বপ্ন। এখন পরিবারগুলোর দাবি একটাই—অবিলম্বে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং স্বচ্ছ ক্ষতিপূরণ।
