মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

লন্ডনে চরম রাজনৈতিক সংকট: ৫ শতাংশ ছাড়াল ঋণের সুদ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ০২:১৭ পিএম

লন্ডনে চরম রাজনৈতিক সংকট: ৫ শতাংশ ছাড়াল ঋণের সুদ

লন্ডনের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘনীভূত হওয়া অনিশ্চয়তা এখন সরাসরি প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে দেশটির অর্থনীতিতে। মঙ্গলবার সকালে ব্রিটিশ বন্ড মার্কেট খোলার পরপরই দেখা গেছে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদের হার ৫ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছে। প্রধানমন্ত্রী স্যার কেয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যে চরম ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে তার ফলেই বিনিয়োগকারীরা এখন ব্রিটিশ সরকারকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফা বা উচ্চ সুদ দাবি করছেন। বাজার বিশ্লেষকদের মতে যখন কোনো দেশের নীতি নির্ধারকদের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়ে তখন আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ বিনিয়োগ করতে গিয়ে বাড়তি সুরক্ষা খোঁজেন। লন্ডনের বর্তমান পরিস্থিতি ঠিক সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বজুড়ে ঋণের ব্যয় এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাজ্য এখন একটি ভিন্ন মাত্রার সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্রিটেনের ঋণের ব্যয় কিছুটা বেশি হওয়ার মূল কারণ হিসেবে রাজনৈতিক অস্থিরতাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত এমন একটি পরিবেশে অর্থ দিতে পছন্দ করেন যেখানে সরকারের অর্থনৈতিক নীতিগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ধারাবাহিকতা থাকবে। স্টারমারের প্রধানমন্ত্রিত্ব এখন খাদের কিনারে থাকায় সেই ধারাবাহিকতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

এদিকে ডাউনিং স্ট্রিটে আজ এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে সাংবাদিকদের ভিড় এবং কড়া নিরাপত্তার মধ্যে উপ-প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিকে দেখা গেছে ১০ নম্বর ভবনে প্রবেশ করতে। ল্যামি সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিলেও তার স্মিত হাসি রাজনৈতিক মহলে অনেক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার ঠিক পরেই অ্যাটর্নি জেনারেল লর্ড রিচার্ড হার্মারকেও ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে দেখা যায়। মন্ত্রিসভার এই সদস্যরা যখন ভেতরে আলোচনায় বসছেন তখন বাইরে বাজারের এই অস্থিরতা তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। স্টারমারকে তার পদের ম্যান্ডেট রক্ষা করার জন্য আজ হয়তো সবচেয়ে কঠিন লড়াইটি লড়তে হবে।

আগামীকাল বুধবার ব্রিটিশ পার্লামেন্টের রাষ্ট্রীয় উদ্বোধনী অধিবেশন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রথা অনুযায়ী রাজা তৃতীয় চার্লস সেখানে উপস্থিত হয়ে সরকারের আগামী এক বছরের পরিকল্পনা বা বিলগুলোর কথা পাঠ করবেন। ওয়েস্টমিনিস্টার এলাকা ইতিমধ্যে রাজকীয় অনুষ্ঠানের জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার নিজেও নিশ্চিত নন যে কাল লাঞ্চের সময় পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকবেন কি না। রাজা যখন ‘আমার সরকার’ শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করবেন তখন সেই সরকারের প্রধান হিসেবে স্টারমার আদৌ উপস্থিত থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে খোদ তার মন্ত্রিসভার সদস্যরাই বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।

রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক এই সংকটের মিলিত ফল হিসেবে ব্রিটিশ পাউন্ড এবং বন্ড মার্কেটে কম্পন অনুভূত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীরা এখন শুধু দেখছেন যে স্টারমার কি তার মন্ত্রিসভাকে একতাবদ্ধ করতে পারেন নাকি নতুন কোনো নেতৃত্বের উত্থান ঘটে। যদি আজকের বৈঠকে কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান না আসে তবে ঋণের সুদের হার আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এটি শুধু সরকারের জন্য নয় বরং সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপরও ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেবে। ডাউনিং স্ট্রিটের ভেতরের আলোচনা এখন শুধু রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই নয় বরং এটি ব্রিটেনের জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন সারা বিশ্বের অর্থনীতিবিদেরা।

banner
Link copied!