মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ২৯ বৈশাখ ১৪৩৩

নবুয়ত থেকে মদিনা: ইসলামের বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক পরিক্রমা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ১২, ২০২৬, ০৫:১০ পিএম

নবুয়ত থেকে মদিনা: ইসলামের বিশ্বজয়ের ঐতিহাসিক পরিক্রমা

নবুয়তের শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইসলামের জয়যাত্রা এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত প্রাপ্ত হন, তখন থেকে এক সুদীর্ঘ ও কণ্টকাকীর্ণ সংগ্রামের সূচনা হয়। আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে তাওহিদের দাওয়াত পৌঁছে দিতে তিনি প্রথমে নিজের বংশ কুরাইশদের বেছে নিয়েছিলেন। সেই সময়ের মক্কার প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো বিপদের আশঙ্কা থাকলে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চিৎকার করে সতর্ক করা হতো। রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন সাফা পাহাড়ের চূড়ায় উঠে কুরাইশদের ডাক দিলেন এবং তাদের সামনে আখেরাত ও রিসালাতের সত্যতা তুলে ধরলেন। তিনি তাদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন যা ইতিহাসের পাতায় প্রথম প্রকাশ্য দাওয়াত হিসেবে স্বীকৃত।

তবে সত্যের এই ডাক তৎকালীন কুরাইশ নেতাদের মনে কোনো রেখাপাত করতে পারেনি। বিশেষ করে আবু লাহাবের মতো নিকটাত্মীয়রা সরাসরি বিরোধিতা শুরু করে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই আবেগভরে দেওয়া আহ্বানের বিপরীতে আবু লাহাব অভিশাপ প্রদান করলে মহান আল্লাহ সুরা লাহাব নাজিল করে তার সমুচিত জবাব দেন। মক্কার বাজারে এবং হজের মৌসুমে যখনই নবীজি (সা.) তাওহিদের ঘোষণা দিতেন, তখনই মুশরিকরা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও কুৎসা রটনায় মেতে উঠত। তাকে কবি, জাদুকর, বাগ্মী কিংবা জিনে ধরা ব্যক্তি হিসেবে প্রচার করা হতো যাতে সাধারণ মানুষ তার কথায় আকৃষ্ট না হয়। তৎকালীন মক্কার সমাজ রাসুল (সা.)-এর এই পবিত্র মিশনকে তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মের অবমাননা এবং নিজেদের নেতৃত্বের প্রতি হুমকি হিসেবে গণ্য করত।

বিরোধিতা কেবল অপপ্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা দ্রুত শারীরিক নির্যাতন ও অশালীন আচরণে রূপ নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন নামাজে সিজদা দিতেন তখন তার পিঠের ওপর পশুর নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করা হতো এবং তার চলাচলের পথে নিয়মিত কাঁটা বিছিয়ে রাখা হতো। কুরাইশদের এই চরম শত্রুতা ও নির্যাতনের মুখেও তিনি তার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। মক্কাবাসীরা যখন কোনোভাবেই ইসলামের সত্যকে গ্রহণ করল না, তখন তিনি একবুক বেদনা নিয়ে তায়েফের অধিবাসীদের কাছে দাওয়াত দিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও তাকে নিষ্ঠুর নির্যাতনের শিকার হতে হয় যা ইসলামের ইতিহাসে এক করুণ অধ্যায় হিসেবে পরিচিত।

এই চরম সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর পক্ষ থেকে হিজরতের অনুমতি আসে এবং নবীজি (সা.) সাহাবিদের পর্যায়ক্রমে মদিনায় যাওয়ার নির্দেশ দেন। মদিনার হিজরত কেবল একটি স্থান পরিবর্তন ছিল না, বরং এটি ছিল ইসলামের বিশ্বজয়ের ভিত্তিপ্রস্তর। মদিনায় পৌঁছানোর পর ইসলামের পবিত্র মাদানি জীবনের শুভসূচনা হয় এবং সেখান থেকেই ইসলামের আলো সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার পথ প্রশস্ত হয়। একদল নিবেদিতপ্রাণ সাহাবির আত্মত্যাগ ও মহানবী (সা.)-এর প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের ফলে ইসলাম আজ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মে পরিণত হয়েছে। গত ১৪০০ বছর ধরে কোটি কোটি মানুষ এই সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে এবং এই অগ্রযাত্রা আজও অব্যাহত রয়েছে। ইসলামের এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে যে সত্যকে দমিয়ে রাখা অসম্ভব এবং ধৈর্যের মাধ্যমেই চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।

banner
Link copied!