ইরানের ভূখণ্ডে অবিস্ফোরিত অবস্থায় পাওয়া অত্যন্ত শক্তিশালী মার্কিন ও ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এখন তেহরানের সামরিক গবেষণাগারে। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সামরিক অঙ্গনে নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটন যে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে ইরানকে দমন করতে চায়, সেই একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইরান কি ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলবে? ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই সম্ভাবনার কথা জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা সম্প্রতি হরমোজগান প্রদেশ থেকে অন্তত ১৫টি ভারী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে। যুদ্ধের ময়দানে এসব অস্ত্র নিক্ষিপ্ত হলেও কারিগরি ত্রুটি বা অন্য কোনো কারণে সেগুলো বিস্ফোরিত হয়নি। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘জিবিইউ-৫৭ বাংকার বাস্টার’ বোমা। প্রায় ১৩ হাজার কেজি ওজনের এই দানবীয় বোমা ১৮ মিটার পুরু কংক্রিট ভেদ করে মাটির নিচে থাকা গোপন বাংকার ধ্বংস করতে সক্ষম। এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র, এজিএম-১৫৮ ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ ড্রোনের অংশবিশেষ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এখন এই অস্ত্রগুলোর ‘রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং’ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং হলো এমন এক পদ্ধতি যেখানে একটি তৈরি করা পণ্যের অভ্যন্তরীণ নকশা ও কার্যপদ্ধতি বিশ্লেষণ করে ঠিক একই ধরনের বা তার চেয়ে উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করা হয়। ইরানের জন্য এটি নতুন কোনো অভিজ্ঞতা নয়। ২০১১ সালে মার্কিন গোয়েন্দা ড্রোন আরকিউ-১৭০ অক্ষত অবস্থায় নামিয়ে এনে সারা বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল তেহরান। পরবর্তীতে সেই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই ইরান তার বর্তমান প্রজন্মের শক্তিশালী শাহেদ ড্রোন বহর তৈরি করেছে যা এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইরানের কট্টরপন্থি সংবাদমাধ্যমগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এসব অস্ত্রের কারিগরি রহস্য উদ্ধারের পর সেই তথ্য রাশিয়া ও চীনের মতো মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে ভাগাভাগি করা হতে পারে। যদি ইরান এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গাইডেড সিস্টেম বা জ্যামিং-প্রতিরোধী প্রযুক্তি বুঝে ফেলে, তবে ভবিষ্যতে মার্কিন প্রযুক্তির হামলা ঠেকানো তাদের জন্য অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। এতে করে মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি বৈশ্বিক সামরিক ভারসাম্যেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তেহরানের ল্যাবরেটরিতে চলমান এই গবেষণা ওয়াশিংটনের পেন্টাগনকেও ভাবিয়ে তুলেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক উপস্থাপক সম্প্রতি এক মন্তব্যে বলেছেন, এই অবিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্রগুলো হবে ‘উপহার’, যা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে একদিন মূল মালিকের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া হবে। অর্থাৎ, প্রতিপক্ষের অস্ত্রই ভবিষ্যতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার প্রচ্ছন্ন হুমকি দিয়েছে তেহরান। এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। ভবিষ্যতে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রযুক্তি যেন এভাবে প্রতিপক্ষের হাতে না পড়ে, সে জন্য হয়তো নতুন কোনো ধ্বংসাত্মক প্রটোকল বা নিরাপত্তা কৌশল নিতে পারে ওয়াশিংটন। আপাতত তেহরানের ল্যাবে মার্কিনি প্রযুক্তির ব্যবচ্ছেদ বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে এক নতুন স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে।
