কল্পনা করুন, পৃথিবীর কোনো বড় কোম্পানি যদি বছরের একটি বিশেষ মাসে বিনিয়োগের বিপরীতে ৭০০ গুণ মুনাফার অফার দেয়, তবে মানুষ কতটা উদগ্রীব হবে! পার্থিব সামান্য লাভের জন্য আমরা যদি এতটা মরিয়া হতে পারি, তবে মহাবিশ্বের অধিপতি মহান আল্লাহ যখন তাঁর বান্দাদের জন্য ‘রহমতের সেল’ বা বিশেষ অফার ঘোষণা করেন, তখন আমাদের কতটা সচেতন হওয়া প্রয়োজন? রমজান মাস হলো সেই কাঙ্ক্ষিত সময়, যেখানে প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা অকল্পনীয়ভাবে বাড়িয়ে দেন। এটি কেবল একটি মাস নয়, বরং মুমিনের আমলনামা ভারী করার এক ঐশ্বরিক সুযোগ।
রমজান মাস কেন এত বিশেষ এবং কেন এই মাসে সওয়াবের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তা বুঝতে হলে এই মাসের মাহাত্ম্য অনুধাবন করতে হবে। এই মাসেই মানবজাতির হেদায়েতের দিশারি পবিত্র কোরআন নাজিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী, রমজান শুরু হলেই জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানকে শিকলবন্দী করা হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা বান্দার জন্য ইবাদতের এক পরম অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দেন। শয়তানি ধোঁকা থেকে মুক্ত হয়ে বান্দা যেন অনায়াসেই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে, এটাই এই মাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
রমজান মাসে সওয়াব বৃদ্ধির পরিমাণ সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে অত্যন্ত চমৎকার বর্ণনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, আদম সন্তানের প্রতিটি নেক আমল ১০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়, তবে রোজার বিষয়টি ভিন্ন। রোজা রাখা হয় কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং এর প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে দেবেন। আলেমদের মতে, রোজার সওয়াব কোনো নির্দিষ্ট গাণিতিক সংখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। এটি যেন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল ‘ব্ল্যাংক চেক’, যা তিনি তাঁর রোজাদার বান্দার নিষ্ঠা অনুযায়ী পূর্ণ করবেন। রমজানে একটি সাধারণ নফল ইবাদত অন্য সময়ের ফরজের সমান এবং একটি ফরজ আমল সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াব বহন করে।
এই মাসের বিশেষ অফারগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো লাইলাতুল কদর। পবিত্র কোরআনের ঘোষণা অনুযায়ী, এই একটি রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। অর্থাৎ ৮৩ বছরেরও বেশি সময় ইবাদত করলে যে সওয়াব পাওয়া যেত, তা কেবল এক রাতেই অর্জন করা সম্ভব। এছাড়া রমজানে উমরাহ পালনের গুরুত্বও অপরিসীম। রাসূলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন, রমজানে একটি উমরাহ আদায় করা তাঁর সাথে হজ করার সমতুল্য সওয়াব বয়ে আনে। এই বিশাল প্রতিদানের হাতছানি প্রতিটি মুমিনকে ইবাদতে আরও বেশি উৎসাহিত করে।
তবে এই সুযোগের পাশাপাশি একটি কঠোর সতর্কবাণীও রয়েছে। যে ব্যক্তি রহমত ও মাগফিরাতের এই বিশাল অফার পাওয়ার পরও নিজের গুনাহ মাফ করাতে পারল না, তার মতো দুর্ভাগা আর কেউ নেই। জিবরাইল (আ.)-এর দোয়া এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ‘আমিন’ বলার মাধ্যমে সেই ব্যক্তির ধ্বংস অনিবার্য হয়ে পড়ে, যে রমজান পেয়েও অলসতায় কাটিয়ে দেয়। তাই রমজান মানে কেবল উপবাস থাকা নয়, বরং এর মূল উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা খোদাভীতি অর্জন করা।
রমজানে সওয়াব বৃদ্ধির এই গাণিতিক হিসাব মূলত বান্দাকে আধ্যাত্মিকভাবে শক্তিশালী করার জন্য। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন আল্লাহর জিকিরে কাটে এবং প্রতিটি আমল যেন নিষ্ঠার সাথে হয়, সেই প্রচেষ্টা চালানোই মুমিনের কাজ। আল্লাহর এই রহমতের অফার এখন চলমান। সময় ও সুযোগ শেষ হওয়ার আগেই আমাদের উচিত তওবা ও ইবাদতের মাধ্যমে নিজেদের আমলনামা সওয়াব দ্বারা পূর্ণ করে নেওয়া। প্রতিটি নেক আমল যেন আমাদের পরকালীন মুক্তির উসিলা হয়, সেই প্রার্থনা করা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন :