বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

বিসমিল্লাহর গুরুত্ব ও ফজিলত: ইসলামি জীবনবিধানের এক অনন্য চাবিকাঠি

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:১৪ এএম
বিসমিল্লাহর গুরুত্ব ও ফজিলত: ইসলামি জীবনবিধানের এক অনন্য চাবিকাঠি

পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও প্রতিটি নেক কাজের শুরুতে বিসমিল্লাহ পাঠ করা মুমিনের অনন্য বৈশিষ্ট্য।

বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি এবং মুমিনের জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপের এক শক্তিশালী ভিত্তি। পবিত্র কোরআনের প্রত্যেকটি সূরার শুরুতে (সূরা আত-তাওবা ব্যতীত) এই পবিত্র বাক্যটি স্থান পেয়েছে, যা বাহ্যিক অলংকারের পাশাপাশি গভীর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক গুরুত্ব বহন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর সর্বপ্রথম যখন ওহী নাযিল হয়, তখন সূরা আল-আলাকের শুরুতে মহান আল্লাহর নাম নিয়ে পাঠ শুরু করার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় ইসলামি শরীয়তে প্রতিটি কল্যাণকর কাজের সূচনা বিসমিল্লাহর মাধ্যমে করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। এটি পাঠ করার মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে নেয় যে, পৃথিবীতে সে যা কিছু ভোগ করছে এবং যে কাজই সম্পাদন করছে, তা তার নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নয় বরং মহান আল্লাহর অসীম মেহেরবানীর ফসল।

বিসমিল্লাহর মূল তিনটি শব্দের মধ্যে মহান আল্লাহর নিজস্ব নাম ‍‍`আল্লাহ‍‍` এবং তাঁর দুটি বিশেষ গুণবাচক নাম ‍‍`আর-রাহমান‍‍` ও ‍‍`আর-রাহীম‍‍` সন্নিবেশিত রয়েছে। আরবী ভাষায় ‍‍`রহম‍‍` শব্দ থেকে এ দুটি নাম উৎসারিত হয়েছে, যার অর্থ দয়া বা অনুগ্রহ। মুফাসসিরগণের মতে, ‍‍`রহমান‍‍` শব্দটি মহান আল্লাহর এমন একটি গুণবাচক নাম যা অন্য কারো জন্য ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম বা নাজায়েয (তাবারী)। এটি তাঁর এমন এক ব্যাপক দয়াকে নির্দেশ করে যা জগতের সকল সৃষ্টির জন্য অবারিত। অন্যদিকে ‍‍`রাহীম‍‍` শব্দটি আল্লাহর গুণের পাশাপাশি কোনো মানুষের গুণ হিসেবেও নির্দিষ্ট অর্থে ব্যবহৃত হতে পারে। অনেক তাফসীরবিদের মতে, আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার ক্ষেত্রে ‍‍`রহমান‍‍` অর্থাৎ তিনি এখানে মুমিন-কাফির নির্বিশেষে সকলকে রিযিক ও রহমত দান করেন, আর আখেরাতে তিনি কেবল মুমিনদের জন্য ‍‍`রাহীম‍‍` বা পরম দয়ালু হিসেবে আবির্ভূত হবেন (বাগভী)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর যাপিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহর আমলকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন। সহীহ হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো সূরার সমাপ্তি এবং পরবর্তী সূরার সূচনা ততক্ষণ পর্যন্ত বুঝতে পারতেন না, যতক্ষণ না জিবরাঈল (আ.) বিসমিল্লাহ নিয়ে আসতেন (আবু দাউদ, ৭৮৮)। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের ছোট-বড় প্রতিটি কাজ যেমন খাবার গ্রহণ, ওযু করা, গৃহ থেকে বের হওয়া, এমনকি বাহনে ওঠার সময়ও বিসমিল্লাহ পাঠের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী, খাবার খাওয়ার শুরুতে (বুখারী, ৫৩৭৬), শোয়ার সময় (আবু দাউদ, ৫০৫৪), মসজিদে প্রবেশের সময় (ইবনে মাজাহ, ৭৭১) এবং ঘর থেকে বের হওয়ার সময় (আবু দাউদ, ৫০৯৫) বিসমিল্লাহ পাঠ করা অত্যন্ত বরকতময় আমল। এমনকি রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে প্রেরিত চিঠিতেও তিনি বিসমিল্লাহ লিখেছিলেন (বুখারী, ৭)।

ইসলামি শরীয়তের বিধানে কিছু ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহ পাঠ করা ওয়াজিব বা আবশ্যক। যেমন পশু যবেহ করার সময় বিসমিল্লাহ বলা অপরিহার্য (বুখারী, ৯৮৫)। আবার পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত শুরু করার ক্ষেত্রে বিসমিল্লাহর পাশাপাশি আউযুবিল্লাহ পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, অতএব যখন তুমি কোরআন পাঠ করবে, তখন বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করো (সূরা আন-নাহল, ৯৮)। বিসমিল্লাহ পাঠ করার অর্থ হলো আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা এবং নিজের অক্ষমতা স্বীকার করে তাঁর অসীম ক্ষমতার ওপর ভরসা করা। মানুষ যখন আল্লাহর নাম নিয়ে কোনো কাজ শুরু করে, তখন শয়তান সেই কাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে না এবং কাজটিতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ও কল্যাণ নাযিল হয়।

বিসমিল্লাহর বরকত কেবল আধ্যাত্মিক নয়, বরং এটি মানুষের দৈনন্দিন বিপদ-আপদ থেকেও রক্ষা করে। একটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যায় এই দোয়াটি পাঠ করতেন, যার অর্থ হলো—আমি সেই আল্লাহর নামে শুরু করছি যাঁর নামে শুরু করলে যমীন ও আসমানে কেউ কোনো ক্ষতি করতে পারে না (আবু দাউদ, ৫০৮৮)। এই ঘোষণার মাধ্যমে একজন মুমিন নিজেকে পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহর কাছে সমর্পণ করে দেয়। সুতরাং প্রতিটি মুমিনের উচিত তাদের প্রতিটি হালাল ও কল্যাণকর কাজের শুরুতে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহীম পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা, যাতে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর অশেষ রহমত ও নূর সাথী হয়।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!