পবিত্র কোরআনের প্রথম সূরা আল-ফাতিহার তৃতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী গুণবাচক নাম ব্যবহার করেছেন—`আর-রাহমান` ও `আর-রাহীম`। এই দুটি শব্দই মূলত `রহম` বা দয়া ধাতু থেকে উৎপন্ন, যা আধিক্য ও স্থায়িত্বের অর্থ প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলা যে কেবল বিশ্বজগতের প্রতিপালক (রব) তা-ই নয়, বরং তাঁর এই প্রতিপালন প্রক্রিয়ার মূল ভিত্তিই হলো অসীম দয়া ও মমতা। কোনো বিনিময় বা বাধ্যবাধকতা ছাড়াই তিনি তাঁর সৃষ্টিজগতকে লালন করছেন। সূরা আল-আরাফের ১৫৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন যে, "আমার রহমত সব কিছুকেই ব্যাপ্ত করে আছে।" এই ঘোষণার বাস্তব প্রতিফলনই হলো তাঁর `আর-রাহমান` ও `আর-রাহীম` সত্তা।
তাফসীরবিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, `আর-রাহমান` শব্দটি আল্লাহর এমন এক ব্যাপক দয়াকে নির্দেশ করে যা দুনিয়াতে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এই গুণের কারণেই তিনি নাস্তিক, মুশরিক, অবাধ্য কিংবা পাপাচারী কাউকেই জীবন-জীবিকা থেকে বঞ্চিত করেন না। রোদ, বৃষ্টি, বাতাস এবং প্রকৃতির সমস্ত নেয়ামত বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষে সকলেই ভোগ করছে। আল্লাহ মানুষকে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত যা ইচ্ছা তা করার সুযোগ দিয়েছেন কেবল তাঁর `রহমান` গুণের কারণে। অর্থাৎ, দুনিয়াতে তাঁর দয়া কোনো বিশেষ গোত্র বা ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা নিখিল সৃষ্টির জন্য অবারিত।
অন্যদিকে, `আর-রাহীম` শব্দটি আল্লাহর সেই বিশেষ রহমতকে নির্দেশ করে যা কেবল পরকালে তাঁর অনুগত বান্দা বা মুমিনদের জন্য নির্ধারিত থাকবে। আরবি ব্যাকরণে `রাহীম` শব্দটি স্থায়িত্ব ও বিশেষত্বের গুণ বহন করে। দুনিয়াতে যারা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলেছে এবং আখেরাতের রহমত পাওয়ার যোগ্য কর্মপন্থা অবলম্বন করেছে, হাশরের ময়দানে কেবল তারাই এই বিশেষ করুণার অধিকারী হবে। এ কারণেই অনেক আলেম আল্লাহকে `রাহমানাদ্দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ` (দুনিয়া ও আখেরাতের রহমান) হিসেবে সম্বোধন করেন। দুনিয়াতে তাঁর দয়া সাধারণ ও নিরপেক্ষ হলেও আখেরাতে তা হবে বিশেষিত এবং কেবল মুমিনদের জন্য সংরক্ষিত।
`রাব্বুল আলামীন` বলার পরপরই `আর-রাহমান` ও `আর-রাহীম` উল্লেখ করার পেছনে গভীর রহস্য রয়েছে। এর মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহর এই বিশাল মহাবিশ্ব শাসন ও পরিচালনার পদ্ধতি কোনো স্বৈরাচারী শাসকের মতো নয়, বরং তা দয়া ও অনুকম্পায় সিক্ত। তিনি মানুষকে ভুল করার সুযোগ দেন, তওবা করার পথ খোলা রাখেন এবং বারবার ক্ষমা করেন। তবে একই সঙ্গে `রাহমান` এর পর `রাহীম` শব্দের বিন্যাস মুমিনদের সতর্ক করে দেয় যে, দুনিয়ার সাধারণ নেয়ামত পেয়ে যেন কেউ আখেরাতকে ভুলে না যায়। প্রকৃত সফলতা কেবল তখনই আসবে যখন পরকালে আল্লাহর সেই বিশেষ রহমত বা `রাহীমিয়াত` অর্জন করা সম্ভব হবে।
মুমিনের জীবনে এই দুটি নামের প্রভাব অপরিসীম। যখন কোনো বান্দা বুঝতে পারে যে তার রব পরম দয়াময়, তখন তার মনে আশা ও ভালোবাসার সঞ্চার হয়। সে বিপদে ভেঙে পড়ে না, বরং আল্লাহর রহমতের ওপর ভরসা করে। একই সঙ্গে সে আল্লাহর বিশেষ দয়া পাওয়ার প্রত্যাশায় নিজের আমল ও আখলাককে সংশোধন করার প্রেরণা পায়। মহান আল্লাহর এই অনন্ত করুণার সাগরে অবগাহন করাই মানুষের জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত। পরকালে যেন আমরা সকলেই তাঁর সেই বিশেষ রহমতের চাদরে আশ্রয় পেতে পারি, সেই কামনাই মুমিনের অন্তরের প্রার্থনা।

আপনার মতামত লিখুন :