বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

সৎ নেতা নির্বাচনের ইসলামি মূলনীতি: খলিফা উমরের ঐতিহাসিক শিক্ষা

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম
সৎ নেতা নির্বাচনের ইসলামি মূলনীতি: খলিফা উমরের ঐতিহাসিক শিক্ষা

উমর (রা.)-এর ইনসাফ: বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেমন নেতা প্রয়োজন আমাদের

বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেতৃত্ব নির্বাচন এবং উপযুক্ত জনপ্রতিনিধি বাছাই করা নাগরিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়শই দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে যে, কার হাতে ক্ষমতা তুলে দিলে ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তি নিশ্চিত হবে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে নেতৃত্ব কোনো সাধারণ পদমর্যাদা নয়, বরং এটি একটি পবিত্র আমানত এবং অত্যন্ত ভারী এক গুরুদায়িত্ব। এই আমানত রক্ষায় সামান্য বিচ্যুতি ঘটলে পরকালে মহান আল্লাহর দরবারে কঠিন জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে। ইসলাম কোনো নির্দিষ্ট দল বা প্রতীকের কথা বলে না, বরং কিছু শাশ্বত মূলনীতির কথা বলে যা অনুসরণ করলে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠন সম্ভব।

ইসলামের ইতিহাসের সোনালি অধ্যায়গুলোতে দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, শাসকের জবাবদিহিতা এবং প্রজার অধিকার রক্ষার মানদণ্ড ছিল আকাশচুম্বী। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা আমিরুল মুমিনিন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর শাসনামলের একটি ঘটনা এক্ষেত্রে চিরকালীন পাথেয় হয়ে আছে। তৎকালীন মিশরের গভর্নর ছিলেন প্রখ্যাত সাহাবি আমর ইবনুল আস (রা.)। সেই সময় আরবে ঘোড়দৌড় ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। একদিন মিশরে আয়োজিত এক প্রতিযোগিতায় গভর্নরের ছেলে মুহাম্মদ এবং জনৈক স্থানীয় খ্রিস্টান নাগরিকের ঘোড়া অংশ নেয়। প্রতিযোগিতায় সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাধারণ নাগরিকের ঘোড়াটি প্রথম স্থান অধিকার করে। আভিজাত্যের অহংকার এবং ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে গভর্নরের ছেলে এই পরাজয় মেনে নিতে পারেননি। তিনি সাধারণ সেই ব্যক্তিকে চাবুক দিয়ে আঘাত করে বলেন যে, তিনি একজন অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তির সন্তান, তাই তার পরাজয় অসম্ভব।

সেই মজলুম ব্যক্তিটি জানতেন যে, মদিনার খেলাফতে ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচারের পাল্লা অনেক বেশি ভারী। তিনি সুদূর মিশর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মদিনায় খলিফা উমরের দরবারে উপস্থিত হয়ে নালিশ জানান। খলিফা কালবিলম্ব না করে মিশরের গভর্নর ও তার ছেলেকে মদিনায় তলব করেন। জনসমক্ষে আয়োজিত এক বিচার সভায় খলিফা উমর (রা.) সেই সাধারণ মানুষটির হাতে চাবুক তুলে দিয়ে বলেন, যে ব্যক্তি তোমাকে আঘাত করেছে, আজ তুমি সবার সামনে তাকে আঘাত করো। এরপর যখন সেই ব্যক্তি তার প্রতিশোধ গ্রহণ করলেন, খলিফা উমর (রা.) এক ঐতিহাসিক নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, এবার এই চাবুক দিয়ে গভর্নর আমর ইবনুল আসকেও আঘাত করো। যদিও সেই ব্যক্তি গভর্নরের ওপর আঘাত করতে অস্বীকৃতি জানান, কিন্তু খলিফা উমর যে যুক্তি দিয়েছিলেন তা আজীবন শাসকদের জন্য সতর্কবার্তা। তিনি বলেছিলেন, বাবার ক্ষমতার দম্ভের কারণেই ছেলে অন্যায় করার সাহস পেয়েছে, তাই এই অপরাধের দায়ভার পিতাকেও বহন করতে হবে।

এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি বর্তমান সময়ের ভোটার এবং সাধারণ মানুষের জন্য এক স্পষ্ট দিকনির্দেশনা। আমরা যখন কাউকে ভোট দেই বা সমর্থন করি, তখন মূলত আমরা সাক্ষ্য প্রদান করি যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি সৎ ও যোগ্য। ইসলামি শরিয়তের ভাষায় ভোট হলো একটি ‘শাহাদাত’ বা সাক্ষ্যদান। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কেউ ভালো কাজের সুপারিশ করলে তার সওয়াবের অংশ পাবে এবং কেউ মন্দ কাজের সুপারিশ করলে সেই পাপের দায়ভারও তাকে বহন করতে হবে। সুতরাং আমাদের সমর্থিত কোনো নেতা বা তার কর্মীরা যদি এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে, মানুষের হক নষ্ট করে কিংবা দুর্নীতির বিস্তার ঘটায়, তবে সেই পাপের অংশ থেকে ভোটাররাও মুক্ত থাকতে পারবেন না।

নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির ব্যক্তিগত সততার পাশাপাশি তার অধীনস্থদের আচরণের ওপর নজর দেওয়া জরুরি। একজন আদর্শ নেতা শুধু নিজে সৎ হবেন না, বরং তার দলের বা পরিবারের কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করতে না পারে সে বিষয়েও তিনি কঠোর থাকবেন। যদি কোনো নেতার প্রশ্রয়ে তার অনুসারীরা জুলুম বা চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হয়, তবে উমর (রা.)-এর সেই মূলনীতি অনুযায়ী ওই নেতাকেও সেই অন্যায়ের অংশীদার হিসেবে গণ্য করতে হবে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়ার যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তার প্রধান শর্তই হলো এমন নেতৃত্ব বাছাই করা যারা জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবেন, শাসক হিসেবে নয়।

পরিশেষে, কোনো নির্দিষ্ট আবেগ বা বংশীয় ঐতিহ্যের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং বিবেক এবং ইসলামি নীতিমালাকে প্রাধান্য দিয়ে নেতা নির্বাচন করা উচিত। আমাদের একটি ভুল সিদ্ধান্ত যেন আগামী কয়েক বছরের জন্য জনদুর্ভোগের কারণ না হয়। ক্ষমতার দাপট দেখানো ব্যক্তির চেয়ে খোদাভীরু এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়াই মুমিনের কাজ। আমরা যদি একটি নিরাপদ ও শান্তিময় সমাজ চাই, তবে আমাদের অবশ্যই এমন নেতৃত্বকে বেছে নিতে হবে যারা মহান আল্লাহকে ভয় করেন এবং জনগণের প্রতি দয়াশীল। কারণ দুনিয়ার ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হলেও আখেরাতের আমলনামা এবং জবাবদিহিতা চিরস্থায়ী।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!