মানুষের জীবন এক নিরন্তর সংগ্রামের নাম যেখানে সাফল্য ও ব্যর্থতা মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠের মতো জড়িয়ে থাকে। অনেক সময় আমরা কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে ভেঙে পড়ি এবং আমাদের আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলি। কিন্তু একজন মুমিনের জন্য ইসলাম এমন এক অনন্য জীবনদর্শন প্রদান করেছে যেখানে হতাশার কোনো স্থান নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে মোটিভেশন বা অনুপ্রেরণা কেবল সাময়িক কোনো আবেগ নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর ওপর অবিচল বিশ্বাস এবং তাঁর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে তার জীবনের প্রতিটি ঘটনা—তা ভালো হোক বা মন্দ—সবই মহান রব্বুল আলামীনের নিখুঁত পরিকল্পনার অংশ, তখন তার ভেতর এক অজেয় মানসিক শক্তি জন্ম নেয়। এই শক্তিই তাকে প্রতিকূলতা জয় করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়।
সাফল্যের পথে বড় বাধা হলো ভয় এবং দুশ্চিন্তা। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে মুমিনদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, তোমরা হীনবল হয়ো না এবং চিন্তিত হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও (সূরা আল-ইমরান, ৩:১৩৯)। এই আয়াতটি প্রতিটি হতাশ হৃদয়ের জন্য এক মহৌষধ। এটি আমাদের শেখায় যে পার্থিব জয়-পরাজয়ই শেষ কথা নয়, বরং ঈমানের ওপর অটল থাকাই হলো প্রকৃত বিজয়। দুনিয়াবী জীবনে আমরা নানাভাবে পরীক্ষিত হই। কখনো সম্পদ হারিয়ে, কখনো প্রিয়জন হারিয়ে আবার কখনো শারীরিক অসুস্থতার মাধ্যমে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা পরীক্ষা করব; তবে আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন (সূরা আল-বাকারা, ২:১৫৫)। এই ঘোষণা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সংগ্রাম জীবনেরই অংশ এবং এই সংগ্রামে যারা ধৈর্য ধারণ করবে, শেষ পর্যন্ত তারাই সফলকাম হবে।
মুমিনের মোটিভেশনের অন্যতম বড় উৎস হলো তওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা। তওয়াক্কুল মানে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং নিজের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যয় করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে শূন্য হাতে শুরু করেও কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা এবং নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে এক বিশাল বিপ্লব সাধন করা যায়। সহীহ বুখারীর প্রথম হাদীসেই নিয়তের গুরুত্ব বর্ণনা করা হয়েছে যেখানে বলা হয়েছে, সকল কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল (সহীহ আল-বুখারী, ১)। যখন আমাদের নিয়ত বা উদ্দেশ্য সৎ থাকে এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তখন সেই কাজে বারাকাহ নাযিল হয়। এই বারাকাহ বা কল্যাণই একজন মানুষকে সীমিত সম্পদ ও সামর্থ্যের মধ্যেও অসাধ্য সাধনে অনুপ্রাণিত করে।
আত্ম-উন্নয়ন বা নিজের ব্যক্তিত্বকে সংশোধন করা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। একজন সফল মুমিন হতে হলে তাকে প্রতিনিয়ত নিজের দোষ-ত্রুটি সংশোধন করতে হয়। ইসলাম আমাদের অলসতা ত্যাগ করে কর্মঠ হওয়ার প্রেরণা দেয়। সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর কাছে দুর্বল মুমিনের চেয়ে অধিক উত্তম এবং প্রিয় (সহীহ মুসলিম, ২৬৬৪)। এখানে শক্তি বলতে কেবল শারীরিক শক্তি নয়, বরং মানসিক দৃঢ়তা, জ্ঞান এবং চারিত্রিক শ্রেষ্ঠত্বকেও বোঝানো হয়েছে। সুতরাং নিজেকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখা, জ্ঞান অর্জন করা এবং দক্ষ করে তোলাও ইবাদতের অংশ। যখন একজন মানুষ এই মহৎ উদ্দেশ্যে নিজেকে গড়ে তোলে, তখন তার মধ্যে কোনো হীনম্মন্যতা থাকে না। সে জানে যে সে এক মহান স্রষ্টার সৃষ্টি এবং তার জীবনের একটি মহৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।
হতাশা কাটানোর জন্য শোকরিয়া বা কৃতজ্ঞতার কোনো বিকল্প নেই। আমরা অধিকাংশ সময় যা পাইনি তা নিয়ে আফসোস করি, কিন্তু যা পেয়েছি তার কথা ভুলে যাই। সূরা আল-ফাতিহার শুরুতে `আলহামদুলিল্লাহ` পাঠ করার মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত এই স্বীকৃতি দেই যে রব্বুল আলামীন আমাদের অজস্র নিয়ামতে ডুবিয়ে রেখেছেন। বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও দেখা গেছে যে যারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটে এবং তারা অধিক কর্মোদ্যমী হয়। ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় যেন আমরা দুনিয়াবী বিষয়ে আমাদের চেয়ে নিচের দিকে থাকা মানুষের দিকে তাকাই, যাতে আল্লাহর নেয়ামতের কদর বুঝতে পারি। এই মানসিকতা আমাদের অল্পে তুষ্ট থাকতে শেখায় এবং বড় কোনো লক্ষ্য অর্জনে স্থিরচিত্ত হতে সাহায্য করে।
পরিশেষে, একজন মুমিনের চূড়ান্ত মোটিভেশন হলো পরকাল এবং আল্লাহর দিদার লাভ করা। দুনিয়ার কষ্ট ও ক্লান্তি তাকে বিচলিত করে না কারণ সে জানে যে তার প্রতিটি কষ্টের বিনিময় আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত আছে। বিচার দিবসের মালিকের ওপর যার অগাধ বিশ্বাস থাকে, সে পার্থিব অন্যায়ে দমে যায় না। জীবনের প্রতিটি পদে বাধা আসবেই, কিন্তু সেই বাধাগুলো ডিঙিয়ে যাওয়ার জন্য কোরআনের আলো ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনাই যথেষ্ট। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো ততই নিকটবর্তী হয়। আল্লাহর রহমত থেকে কেবল পথভ্রষ্টরাই নিরাশ হয়। সুতরাং প্রতিটি ব্যর্থতাকে একটি নতুন শিক্ষা হিসেবে গ্রহণ করে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পুনরায় পথ চলা শুরু করাই হলো প্রকৃত বীরত্ব।

আপনার মতামত লিখুন :