চোখের পলকে রহমতের দিনগুলো পেরিয়ে মাগফিরাতের দশকেরও প্রায় শেষ প্রান্তে আমরা। ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো যেভাবে দ্রুত উল্টে যাচ্ছে, তাতে মনের কোণে এক অস্থিরতা কাজ করা স্বাভাবিক। রমজান শুরু হওয়ার আগে আমাদের অনেকেরই আকাশচুম্বী পরিকল্পনা থাকে—পুরো কোরআন অর্থসহ শেষ করা, প্রতি রাতে তাহাজ্জুদ পড়া কিংবা জীবনটাকে পুরোপুরি বদলে ফেলা। কিন্তু মাঝপথে এসে যখন আমরা আয়নার সামনে দাঁড়াই, তখন একটি প্রশ্নই মনে বারবার উঁকি দেয়, "আমি কি আদৌ কিছু করতে পেরেছি? আমার রোজা কি কেবল উপবাসই থেকে যাচ্ছে?" এই আক্ষেপ কেবল আপনার একার নয়, বরং অনেকেরই। তবে হতাশ হওয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। রমজানের বাকি সময়টুকুতে সওয়াব বহুগুণে বাড়িয়ে তোলার ৭টি বিশেষ উপায় নিয়ে আমাদের আজকের এই নিবিড় বিশ্লেষণ।
সওয়াব বৃদ্ধির প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো নিয়তের পরিশুদ্ধি। প্রতিটি সাধারণ কাজকেও আমরা ইবাদতে রূপান্তর করতে পারি কেবল একটি বিশুদ্ধ নিয়তের মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করেছেন যে, প্রতিটি কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। সাহরি খাওয়ার সময় যদি নিয়ত থাকে আল্লাহর হুকুম পালন ও শক্তি সঞ্চয় করা, তবে সেই খাবার গ্রহণও ইবাদত। এমনকি ইফতারের আয়োজন করা বা রাতে ইবাদতের শক্তি পেতে দুপুরে সামান্য বিশ্রাম নেওয়াও সওয়াবের কারণ হতে পারে। প্রয়োজন শুধু প্রতিটি পদক্ষেপে সচেতনভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত রাখা।
দ্বিতীয়ত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে রোজা কেবল পেটের উপবাস নয়। প্রকৃত রোজা হলো প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পাপমুক্ত রাখা। যদি জিহ্বা মিথ্যা বলে, কান গীবত শোনে আর চোখ হারামে লিপ্ত থাকে, তবে সেই পানাহার ত্যাগের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই। চোখের রোজা, কানের রোজা এবং জিহ্বার সংযম যখন একত্রিত হয়, তখনই রোজার প্রকৃত স্বাদ ও উদ্দেশ্য সাধিত হয়। একইসাথে রমজানের সাথে কোরআনের যে নিবিড় সম্পর্ক, তা আরও গভীর করতে হবে। কোরআন কেবল দ্রুত গতিতে খতম করার প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি আয়াত হলেও তার অর্থ ও তাফসীর বুঝে পড়া এবং জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি। ‘তাদাব্বুর’ বা গভীর চিন্তা-ভাবনা ঈমানকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
রাতের ইবাদতকে আঁকড়ে ধরা সওয়াব অর্জনের অন্যতম দ্রুততম পথ। তারাবীহর পাশাপাশি রাতের শেষভাগে অন্তত দুই রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। বিশেষ করে শেষ দশক তো ইবাদতের বসন্তকাল। এই সময়েই লুকিয়ে আছে লাইলাতুল কদর, যা হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দিনগুলোতে ইবাদতের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতেন। পাশাপাশি দানের হাতকে প্রশস্ত করা জরুরি। রমজানে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দানশীলতা বাতাসের বেগে ছড়িয়ে পড়ত। অন্যকে ইফতার করানোর মাধ্যমে নিজের সওয়াব দ্বিগুণ করার সুযোগ কেউ হারাতে চায় না।
দোয়া হলো ইবাদতের মগজ এবং রমজান হলো দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ মৌসুম। বিশেষ করে ইফতারের ঠিক আগ মুহূর্তটি অত্যন্ত সংবেদনশীল, যখন আল্লাহ বান্দার কোনো দোয়াই ফিরিয়ে দেন না। একটি ‘দোয়া লিস্ট’ বা তালিকা তৈরি করে নিজের, পরিবারের এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর জন্য চোখের পানি ফেলে প্রার্থনা করা উচিত। পরিশেষে, আমলের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহর কাছে সেই আমলই সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়—তা পরিমাণে অল্প হলেও। রমজানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট আমলগুলো নিয়মিত করে যেতে পারলে তা-ই কেয়ামতের দিন নাজাতের অসিলা হতে পারে।
রমজান এক দ্রুতগামী মেহমান, যে আমাদের দুয়ারে এসেছে আমাদের পাপমুক্ত করতে। এই অমূল্য মুহূর্তগুলো যেন মোবাইল বা অপ্রয়োজনীয় আলাপে নষ্ট না হয়। প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন আল্লাহর জিকিরে কাটে, সেই শপথ আমাদের নিতে হবে। হয়তো এটাই আমাদের জীবনের শেষ রমজান। তাই আসুন, এই ৭টি মূলনীতি অনুসরণ করে রমজানের বাকি দিনগুলোকে সার্থক করে তুলি এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হই।

আপনার মতামত লিখুন :