বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

রোজা ভাঙলে করণীয়: কাজা ও কাফফারা আদায়ের সঠিক পদ্ধতি

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ১১:৪৮ পিএম
রোজা ভাঙলে করণীয়: কাজা ও কাফফারা আদায়ের সঠিক পদ্ধতি

রমজানে ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গের বিধান: কাজা ও কাফফারার শরয়ী বিশ্লেষণ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি হলো পবিত্র রমজান মাসের রোজা। প্রত্যেক সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক ও মুকিম মুসলমানের ওপর এই মাসে রোজা পালন করা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অপরিহার্য ইবাদত বা ফরজ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর; যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। তবে এই মহান ইবাদতকে কেন্দ্র করে অনেক সময় অবহেলা বা অজ্ঞতাবশত রোজা ভঙ্গ করার মতো ঘটনা ঘটে। ইসলামে রোজা ভঙ্গ করার কারণ এবং এর পরবর্তী বিধানকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

সাধারণত রোজা ভঙ্গের বিষয়টি দুইভাবে বিবেচ্য। প্রথমত, শরীয়তসম্মত কোনো ওজরের কারণে রোজা না রাখা বা ভেঙে ফেলা। যদি কোনো ব্যক্তি গুরুতর অসুস্থ হন, যা রোজা রাখলে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তবে তিনি রোজা ভঙ্গ করতে পারেন। এছাড়া দীর্ঘ সফর, নারীদের বিশেষ শারীরিক অবস্থা (হায়েজ ও নেফাস), গর্ভধারণ বা দুগ্ধদানকালে সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা এবং জীবনহানির মতো তীব্র ক্ষুধা বা তৃষ্ণার ক্ষেত্রে রোজা ভাঙার অনুমতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিগুলোকে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য সহজতা হিসেবে দেখা হয়। এমন ওজরের কারণে রোজা ভাঙলে ব্যক্তিকে প্রতিটি রোজার পরিবর্তে শুধুমাত্র একটি রোজা কাজা করতে হবে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৪)। অর্থাৎ রমজানের পর সুবিধাজনক সময়ে সমপরিমাণ রোজা আদায় করে নিলেই জিম্মাদারি সম্পন্ন হবে।

দ্বিতীয়ত, কোনো বৈধ কারণ বা ওজর ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের রোজা ভেঙে ফেলা। এটি একটি ভয়াবহ কবীরা গুনাহ বা মহাপাপ। ইসলামী শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করে, তবে তার ওপর কাজা এবং কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়। কাজা হলো একটি রোজার পরিবর্তে একটি রোজা রাখা, আর কাফফারা হলো এর জরিমানা স্বরূপ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। বর্তমানে প্রচলিত বিধান অনুযায়ী, ইচ্ছাকৃত একটি রোজা ভঙ্গের কাফফারা হলো ধারাবাহিকভাবে বিরতিহীনভাবে ৬০টি রোজা রাখা। যদি কেউ শারীরিক অক্ষমতার কারণে এই দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে না পারেন, তবে তাকে ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা তৃপ্তিভরে খাওয়াতে হবে অথবা সমপরিমাণ অর্থ দান করতে হবে।

ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গের পরকালীন পরিণতি অত্যন্ত আতঙ্কের। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) এক স্বপ্নে দেখেন যে কিছু লোককে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং তাদের মুখগহ্বর ছিঁড়ে রক্ত ঝরছে। জিবরাঈল (আ.) এর কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, এরা সেই সব ব্যক্তি যারা সময়ের আগেই অর্থাৎ বিনা কারণে রোজা ভেঙে ফেলেছিল (সহীহ ইবনে হিব্বান, ৭৪৯১)। এছাড়া তিরমিযী শরীফের বর্ণনায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি শরীয়তসম্মত কারণ ছাড়া রমজানের একটি রোজাও ত্যাগ করে, তবে সারা জীবনের নফল রোজা দিয়েও সেই একটি ফরজের ঘাটতি বা ফজিলত পূর্ণ করা সম্ভব নয় (সুনানে তিরমিযী, ৭২৩)।

পরিশেষে, রোজা শুধুমাত্র না খেয়ে থাকার নাম নয়, বরং এটি নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ এবং তাকওয়া অর্জনের প্রশিক্ষণ। ইচ্ছাকৃতভাবে এই ফরজ ইবাদত অবজ্ঞা করা ঈমানী দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। যদি অতীতে এমন কোনো ভুল হয়ে থাকে, তবে বিলম্ব না করে মহান আল্লাহর দরবারে খাঁটি মনে তওবা করা এবং দ্রুত কাজা ও কাফফারা আদায়ের মাধ্যমে নিজেকে পবিত্র করা আবশ্যক। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করার এবং সহীহভাবে প্রতিটি ইবাদত পালন করার তাওফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!