রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য এক আত্মশুদ্ধি ও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠ সময়। ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এই রোজা পালন করা প্রত্যেক সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর ফরজ। তবে মানবীয় সীমাবদ্ধতা বা বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় রোজা রাখা সম্ভব হয় না কিংবা মাঝপথে রোজা ভেঙে যায়। এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী শরীয়ত অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিজ্ঞানসম্মত সমাধান দিয়েছে। রোজা ভাঙার কারণ ও ধরনভেদে এর প্রতিকারকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—কাজা, কাফফারা এবং ফিদিয়া। এই বিধানগুলো সঠিকভাবে জানা প্রতিটি মুমিনের জন্য অপরিহার্য, যাতে করে ভুলবশত কোনো ত্রুটি হলে তা সঠিক পদ্ধতিতে সংশোধন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব হয়।
যদি কোনো ব্যক্তি শরীয়তসম্মত ওজরের কারণে রোজা রাখতে না পারেন কিংবা রোজা ভেঙে ফেলতে বাধ্য হন, তবে তাকে পরবর্তীতে সেই রোজার পরিবর্তে শুধুমাত্র একটি রোজা আদায় করতে হয়, যাকে `কাজা` বলা হয়। শরীয়ত অনুমোদিত এই কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো অসুস্থতা। যদি কেউ এমন অসুস্থ হয়ে পড়েন যে রোজা রাখা তার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ বা রোগ বৃদ্ধির কারণ হতে পারে, তবে তিনি রোজা ভাঙতে পারেন। একইভাবে দীর্ঘ পথ সফরের ক্ষেত্রেও ইসলাম সহজতা প্রদান করেছে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৪)। নারীদের ক্ষেত্রে মাসিক স্রাব বা প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব চলাকালীন রোজা রাখা নিষিদ্ধ, যা পরবর্তীতে কাজা করে নেওয়া বাধ্যতামূলক (সহীহ মুসলিম, ৩৩৫)। গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মায়েরা যদি নিজের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তবে তারাও রোজা ভাঙার অনুমতি পান। এই কাজা রোজাগুলো রমজানের পর সুবিধাজনক সময়ে একটি একটি করে বা ধারাবাহিকভাবে আদায় করা যায়।
তবে যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই সম্পূর্ণ ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের রোজা ভঙ্গ করেন, তবে তা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ বা কবীরা গুনাহ হিসেবে গণ্য হয়। এক্ষেত্রে তাকে কাজা করার পাশাপাশি `কাফফারা` বা কঠিন জরিমানা আদায় করতে হয়। ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার বা স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করলে একটি রোজার বিপরীতে বিরতিহীনভাবে টানা ৬০টি রোজা রাখা ওয়াজিব। যদি শারীরিক অক্ষমতার কারণে এই ধারাবাহিক রোজা রাখা সম্ভব না হয়, তবে তাকে ৬০ জন অসহায় ব্যক্তিকে দুই বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে। বিনা ওজরে রোজা ত্যাগের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি কোনো বৈধ ওজর ছাড়া রমজানের একটি রোজাও ত্যাগ করে, তবে সে যদি সারাজীবনও নফল রোজা পালন করে, তবুও সেই একটি রোজার ফজিলত বা ক্ষতিপূরণ লাভ করতে পারবে না (সুনানে তিরমিযী, ৭২৩)।
শারীরিক অক্ষমতার কারণে যারা একেবারেই রোজা রাখতে পারেন না, তাদের জন্য ইসলামে `ফিদিয়া`র ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটি মূলত অতি বৃদ্ধ বা এমন দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য, যাদের সুস্থ হয়ে কাজা আদায় করার সম্ভাবনা নেই। তারা প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে এক বেলার খাবার বা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাদ্যশস্যের মূল্য দান করবেন। এটি মূলত আল্লাহর এক বিশেষ রহমত, যাতে করে কেউ ইবাদতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত না হয়। রোজা ইসলামের একটি স্পর্শকাতর ইবাদত হওয়ায় এর প্রতিটি বিধানের পেছনে হিকমত নিহিত রয়েছে। তাই অনিচ্ছাকৃত ভুল হলে আল্লাহর কাছে তওবা করে কাজা আদায় করা এবং ইচ্ছাকৃত ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর অনুশোচনার মাধ্যমে কাফফারা আদায় করে ঈমানি জিম্মাদারি পূরণ করা প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য।

আপনার মতামত লিখুন :