বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

ইসলামে রমজান মাসের শুরু ও রোজা ফরয হওয়ার ঐতিহাসিক ইতিহাস

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ১২:১৮ এএম
ইসলামে রমজান মাসের শুরু ও রোজা ফরয হওয়ার ঐতিহাসিক ইতিহাস

রমজান মাস বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য এক পরম বরকতময় সময়। আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এই বিধানটি ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কুরআনের বর্ণনানুসারে সিয়াম বা রোজা রাখার এই ইবাদতটি কেবল উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য নতুন কোনো বিষয় ছিল না। মহান আল্লাহ সূরা আল বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন যে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ওপরও রোজা ফরয করা হয়েছিল যাতে মানুষ তাকওয়া অর্জন করতে পারে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৩)। মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে হযরত নূহ আ., হযরত মুসা আ. এবং হযরত ঈসা আ. পর্যন্ত প্রতিটি নবীর যুগেই ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে রোজা পালনের রীতি প্রচলিত ছিল। আদি মানব হিসেবে হযরত আদম আ. এবং হযরত হাওয়া আ. জান্নাতে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল ভক্ষণের পর অনুশোচনা হিসেবে দীর্ঘকাল রোজা রেখেছিলেন বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন নবী-রাসূলের আমলে আইয়্যামে বিজ বা চান্দ্রমাসের নির্দিষ্ট দিনে রোজা পালনের বিধান ছিল যা তৎকালীন সমাজকে আধ্যাত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ রাখত।

ইসলামে বর্তমানে আমরা যে রমজান মাসের এক মাসব্যাপী রোজা পালন করি তা নির্দিষ্টভাবে ফরয হয়েছে হিজরি দ্বিতীয় সনে। রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং সাহাবায়ে কেরাম মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করার প্রায় দেড় বছর পর অর্থাৎ ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে এই বিধান কার্যকর হয়। মদিনায় হিজরতের পর মুসলিমরা প্রথম দিকে আশুরার রোজা এবং প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু নফল রোজা পালন করতেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ যখন মদিনার ইহুদিদের মহররম মাসের ১০ তারিখে রোজা রাখতে দেখেন তখন এর কারণ জানতে পারেন যে এই দিনে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে মুসলিমরাও আশুরার রোজা পালন শুরু করেন যা তৎকালীন সময়ে ওয়াজিব বা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। তবে হিজরি দ্বিতীয় সনের শাবান মাসে যখন রমজানের রোজা ফরয হওয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন আশুরার রোজার আবশ্যকতা শিথিল হয়ে তা নফলে পরিণত হয়। সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে রমজান মাস হলো কুরআন নাযিলের মাস এবং যারা এই মাস পাবে তারা যেন অবশ্যই রোজা রাখে (সূরা আল-বাকারা, ২:১৮৫)।

রমজান মাসকে রোজা পালনের জন্য বেছে নেওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো এই মাসেই মানবজাতির হিদায়াত গ্রন্থ আল কুরআন প্রথম অবতীর্ণ হয়েছে। নবুয়তের ১৫তম বছরে রোজা ফরয হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর জন্য ইবাদতের এক বিশেষ ঋতু শুরু হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর ওফাতের আগ পর্যন্ত মোট ৯টি রমজান মাস রোজা পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন। এই পবিত্র মাসের রোজা পালনের মূল লক্ষ্য হলো মানুষের নফস বা কুপ্রবৃত্তিকে দমন করা এবং আত্মিক উৎকর্ষ সাধন করা। দিনের বেলা পানাহার ও জৈবিক চাহিদা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে একজন মুমিন আল্লাহর প্রতি তার গভীর আনুগত্যের পরিচয় দেন। এটি কেবল একটি উপবাস নয় বরং সহমর্মিতা ও ধৈর্যের এক অনন্য শিক্ষা। ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভবের মাধ্যমে বিত্তবানরা দরিদ্রদের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখেন যা সামাজিকভাবে পরোপকারের মানসিকতা তৈরি করে। রমজানের এই প্রশিক্ষণ একজন মুসলিমকে বছরের বাকি এগারো মাসও ন্যায় ও সত্যের পথে চলতে অনুপ্রাণিত করে। ইসলামে রমজানের আগমনের এই ইতিহাস তাই কেবল একটি তারিখ বা সন নয় বরং এটি মানবজাতির নৈতিক পুনর্গঠনের এক সুমহান অধ্যায়।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

ফিকহ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!