পবিত্র রমজান মাস মুসলিম উম্মাহর জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক অনন্য উপহার। এই মাসটি রহমত, বরকত ও গুনাহ মাফের এক মহিমান্বিত সুযোগ। আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের এই বিশেষ সময়কে তিনটি ভাগে বা দশকে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম দশ দিনকে বলা হয় রহমতের দশক। এরপরের দশ দিন মাগফিরাত বা ক্ষমার এবং শেষ দশ দিন নাজাত বা জাহান্নাম থেকে মুক্তির। রহমতের এই প্রথম দশকে আল্লাহর অসীম করুণার বারিধারা বান্দার ওপর বর্ষিত হয়। অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমান জানতে চান, রমজানের প্রথম ১০ দিনের জন্য বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট দুআ আছে কি না যা পাঠ করলে আল্লাহর রহমত সুনিশ্চিত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিভিন্ন হাদীস থেকে রমজান মাসের মাহাত্ম্য সম্পর্কে জানা যায়। একটি বর্ণনায় এসেছে, রমজানের প্রথম অংশ রহমতের। তবে কুরআন বা বিশুদ্ধ সুন্নাহর আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম দশ দিনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো একটি দুআকে বাধ্যতামূলক বা বিশেষভাবে নির্ধারিত করে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, এমন কোনো নির্দিষ্ট আরবি বাক্য নেই যা না পড়লে রহমতের দশক অপূর্ণ থেকে যাবে। মূলত এই সময়টি আল্লাহর অসীম দয়ার দিকে ধাবিত হওয়ার। মহান আল্লাহ নিজে ‘আর-রাহমান’ ও ‘আর-রাহীম’, তাই এই দশকে তাঁর রহমত কামনায় যেকোনো অর্থবহ ও মাসনুন দুআ করা যেতে পারে।
রহমতের এই দিনগুলোতে বান্দা আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয়ের দুআ বেশি বেশি করতে পারেন। এছাড়া ক্ষমা প্রার্থনা বা ইস্তেগফার এই সময়ের অন্যতম প্রধান আমল। ‘রব্বিগফির ওয়ারহাম ওয়া আনতা খইরুর রহিম’—অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন, আপনিই তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু। এ জাতীয় দুআগুলো রহমতের দশকের মূল চেতনার সাথে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ কামনায় ‘রাব্বানা আতিনা’ দুআটি পড়ার মাধ্যমেও আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করা সম্ভব।
প্রথম দশকের প্রকৃত তাৎপর্য শুধু নির্দিষ্ট কিছু শব্দ উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আমলের মাধ্যমে আল্লাহর রহমতকে নিজের করে নেওয়ার সময়। এই দশকে বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করা অত্যন্ত জরুরি, কারণ রমজান হলো কুরআনের মাস। এছাড়া নফল ইবাদত, বিশেষ করে তারাবীহ ও শেষ রাতের তাহাজ্জুদ বান্দাকে আল্লাহর রহমতের অনেক কাছাকাছি নিয়ে যায়। শুধু পানাহার ত্যাগ নয়, বরং জিহ্বা, চোখ ও কানকে যাবতীয় পাপ থেকে দূরে রাখার মাধ্যমে রোজার প্রকৃত হক আদায় করতে হয়। গীবত, মিথ্যাচার এবং অনর্থক কাজ থেকে নিজেকে সংবরণ করাই রহমত লাভের অন্যতম পূর্বশর্ত।
মানবসেবা এবং দান-সাদাকাহ রহমতের এই দশকে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অসহায় মানুষকে ইফতার করানো বা আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসার মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ দয়া পাওয়া যায়। রমজানের এই প্রাথমিক দিনগুলো মূলত একটি আধ্যাত্মিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়, যা পরবর্তী মাগফিরাত ও নাজাতের দশকে অগ্রসর হতে সাহায্য করে। রহমত ছাড়া আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া কঠিন, তাই এই সময়ে বিনয় ও একাগ্রতার সাথে নিজের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে তওবা করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র রমজানের এই রহমতের দশকের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের সঠিকভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন। আমরা যেন আমাদের আমল ও দুআর মাধ্যমে তাঁর অসীম রহমতের ভাগীদার হতে পারি এবং পরকালীন মুক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারি। ইসলামি জীবনবিধান ও রমজানের আমল সম্পর্কে আরও বিশুদ্ধ তথ্য জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের বিশেষ আয়োজনে।

আপনার মতামত লিখুন :