পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম সূরা এবং উম্মুল কিতাব খ্যাত সূরা আল-ফাতিহার দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, "যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।" এই একটি মাত্র আয়াতের গভীরে লুকিয়ে আছে তওহীদ, কৃতজ্ঞতা এবং মহাবিশ্বের সৃষ্টির রহস্য। `আল-হামদ` শব্দটি কেবল সাধারণ প্রশংসাকে বোঝায় না, বরং এটি এমন এক নির্মল ও সম্ভ্রমপূর্ণ প্রশংসা যা কেবল আল্লাহ তাআলার জন্যই নির্দিষ্ট। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী, এখানে `আল` যুক্ত করে প্রশংসার সমস্ত ধরন ও স্তরকে আল্লাহর জন্য খাস করা হয়েছে। আমাদের চারপাশে আমরা যা কিছু সুন্দর, কল্যাণকর এবং মহৎ দেখি, তার প্রকৃত উৎস হলেন আল্লাহ। কোনো মানুষের গুণ বা কর্মের প্রশংসা করলেও পরোক্ষভাবে তা আল্লাহরই প্রশংসা, কারণ সেই গুণের স্রষ্টা স্বয়ং আল্লাহ।
`হামদ` ও `শুকর` বা কৃতজ্ঞতার মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু বিশাল পার্থক্য রয়েছে। শুকরিয়া সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট নিয়ামত পাওয়ার পর প্রকাশ করা হয়। কিন্তু `হামদ` এর পরিধি অনেক ব্যাপক। কোনো নিয়ামত পাওয়া যাক বা না যাক, সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা করাই হলো হামদ। অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর আপন সত্তার কারণেই প্রশংসিত। তিনি আমাদের কিছু দান করলে যেমন প্রশংসিত, না করলেও তিনি প্রশংসার দাবিদার। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিখিয়েছেন যে, বিপদে বা খারাপ অবস্থায় থাকলেও বলতে হয়—`আলহামদুলিল্লাহি আলা কুল্লি হাল` অর্থাৎ সর্বাবস্থায় আল্লাহরই প্রশংসা (ইবনে মাজাহ, ৩৮০৩)। হাদীসে এই বাক্যটিকে `উত্তম দোয়া` হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে (তিরমিযী, ৩৩৮৩), কারণ এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি পূর্ণ সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
আয়াতে ব্যবহৃত `রব` শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর সাধারণ অর্থ প্রতিপালক মনে হলেও কোরআনী প্রয়োগে এর অর্থ অত্যন্ত বিস্তৃত। রব তিনিই, যিনি কোনো কিছু সৃষ্টি করেন, তার আকার-আকৃতি সুবিন্যস্ত করেন, তার রিযিক ও বেঁচে থাকার উপকরণের পরিমাণ নির্ধারণ করেন এবং তাকে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করেন। আল্লাহর এই `রবুবিয়াত` বা প্রতিপালন দুই ধরনের। প্রথমত, প্রকৃতিগত—যেখানে তিনি জগতের সকল প্রাণীর দেহ ও প্রাণের বিকাশ ঘটান। দ্বিতীয়ত, শরীয়তগত—যেখানে তিনি নবী-রাসূল এবং কিতাব প্রেরণের মাধ্যমে মানুষের আত্মিক ও নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের পথ দেখান। অর্থাৎ, আল্লাহ কেবল আমাদের শরীরেরই লালন-পালন করেন না, বরং আমাদের রূহ বা আত্মার সঠিক দিশারিও তিনি।
`আলামীন` শব্দটি `আলাম` এর বহুবচন, যার অর্থ বিশ্বজগত। মুফাসসিরগণের মতে, আল্লাহ ছাড়া আর যা কিছু বিদ্যমান, তার সবকিছুই আলামীন এর অন্তর্ভুক্ত। আসমান-যমীন, ফেরেশতা, জিন, মানুষ, পশুপক্ষী, এমনকি অনুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায় না এমন অণুজীবও এই জগতের অংশ। প্রতিটি জগতই তার স্রষ্টার অস্তিত্বের এক একটি জীবন্ত নিদর্শন। সূরা আশ-শুয়ারায় ফিরআউনের প্রশ্নের জবাবে হযরত মূসা (আ.) পরিষ্কার বলেছিলেন যে, আসমান, যমীন এবং এই দুইয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে, তার সবকিছুর অধিপতিই হলেন রব্বুল আলামীন (সূরা আশ-শুআরা, ২৩-২৪)। আধুনিক বিজ্ঞান আজও মহাবিশ্বের বিশালতার সামান্য অংশই উন্মোচন করতে পেরেছে, অথচ দেড় হাজার বছর আগেই কোরআন এই অসীম জগতসমূহের একচ্ছত্র মালিক হিসেবে আল্লাহর পরিচয় দান করেছে।
একজন মুমিনের জীবনে `আলহামদুলিল্লাহ` কেবল একটি বুলি নয়, বরং এটি তার জীবনদর্শনের প্রতিফলন। যখন কেউ মন থেকে এই সত্যটি উপলব্ধি করে যে তার জীবনের প্রতিটি স্পন্দন রব্বুল আলামীনের দয়ার ওপর নির্ভরশীল, তখন তার ভেতর থেকে অহংকার দূরীভূত হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতিমাত্রায় প্রশংসাকারীদের নিরুৎসাহিত করেছেন যাতে মানুষের মনে আত্মম্ভরিতা না জাগে (মুসলিম, ৩০০০২)। প্রকৃত প্রশংসা কেবল আল্লাহর। মিযানের পাল্লায় এই `আলহামদুলিল্লাহ` বাক্যটি অত্যন্ত ভারী হবে এবং এটি বান্দাকে জান্নাতের পথে এগিয়ে নেবে। তাই যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, সুখে কিংবা দুঃখে, আল্লাহর এই মহান গুণগান করাই মুমিনের সার্থকতা।

আপনার মতামত লিখুন :