ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম হলো রমজান মাসের রোজা। প্রতিটি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের ওপর এই রোজা পালন করা ফরজ। তবে নানা কারণে অনেকের রোজা মাঝপথে ভেঙে যায় বা রাখা সম্ভব হয় না। এক্ষেত্রে শরীয়তের বিধানে কাজা, কাফফারা ও ফিদিয়া—এই তিনটি আলাদা স্তর রয়েছে। বিশেষ করে ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভঙ্গ করা কেবল একটি বড় গুনাহই নয়, বরং এর জন্য কঠোর প্রায়শ্চিত্ত বা কাফফারা আদায় করা বাধ্যতামূলক। সঠিক জ্ঞান না থাকার কারণে অনেকেই বিভ্রান্তিতে ভোগেন যে, কখন কেবল একটি রোজা রাখলে চলবে আর কখন টানা ৬০টি রোজা রাখা জরুরি।
কাফফারা মূলত একটি জরিমানা বা প্রায়শ্চিত্ত যা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর ফরজ বিধান লঙ্ঘনের শাস্তিস্বরূপ নির্ধারিত। শরীয়তসম্মত কোনো ওজর বা কারণ (যেমন—অসুস্থতা বা সফর) ছাড়া কেউ যদি ইচ্ছাকৃতভাবে পানাহার করে বা স্ত্রীর সাথে সহবাসে লিপ্ত হয়, তবে তার ওপর কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়। মনে রাখতে হবে, যদি কেউ রোজার নিয়তই না করে তবে তাকে কেবল কাজা করতে হবে, কিন্তু নিয়ত করার পর ইচ্ছাকৃতভাবে ভেঙে ফেললে তাকে অবশ্যই কাফফারা দিতে হবে। অন্যদিকে, ভুলবশত কিছু খেয়ে ফেললে বা অসুস্থতার কারণে রোজা ভাঙলে কেবল কাজা বা একটির বদলে একটি রোজা রাখাই যথেষ্ট।
কাফফারা আদায়ের ক্ষেত্রে ইসলামের নির্ধারিত পদ্ধতিটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। এর প্রথম ধাপ হলো একজন দাস মুক্ত করা, যা বর্তমান যুগে প্রচলিত নয়। তাই দ্বিতীয় পদ্ধতি হিসেবে একজন ব্যক্তিকে একটি রোজা ভঙ্গের বিপরীতে একটানা ৬০টি রোজা রাখতে হবে। এই ৬০টি রোজার মধ্যে কোনো বিরতি দেওয়া যাবে না। যদি মাঝপথে কোনো ওজর ছাড়া একদিনও রোজা বাদ পড়ে, তবে পূর্বের সব রোজা বাতিল হয়ে যাবে এবং পুনরায় প্রথম থেকে শুরু করতে হবে। তবে নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ দিনগুলোর বিরতি ক্ষমাযোগ্য এবং তা শেষ হওয়ার পর পুনরায় ধারাবাহিকতা রক্ষা করে বাকিগুলো পূর্ণ করতে হবে।
যাঁরা বার্ধক্য বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের কারণে টানা ৬০টি রোজা রাখতে সক্ষম নন, তাঁদের জন্য তৃতীয় বিকল্প হলো ৬০ জন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাবার খাওয়ানো। এর বিকল্প হিসেবে সাদাকাতুল ফিতরের সমপরিমাণ অর্থ বা খাদ্যশস্য দান করা যেতে পারে। এছাড়া ফিদিয়া নামক আরেকটি বিধান রয়েছে, যা কেবল তাঁদের জন্য প্রযোজ্য যাঁরা অত্যন্ত বৃদ্ধ বা এমন রোগে আক্রান্ত যার থেকে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাঁরা প্রতিটি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাবার দান করবেন।
রোজা ভঙ্গের এই কাফফারা কেবল একটি আর্থিক বা শারীরিক দণ্ড নয়, বরং এটি বান্দার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহর কাছে এক প্রকার তওবা। ইসলামের এই কঠোর বিধান আমাদের রোজার গুরুত্ব ও পবিত্রতা সম্পর্কে সচেতন করে। ইচ্ছাকৃতভাবে একটি রোজা ত্যাগ করার ক্ষতি সারা বছর রোজা রেখেও পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই আমাদের উচিত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি রোজা পালন করা এবং কোনো কারণে ভুল হয়ে গেলে দ্রুত শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী তা সংশোধন করে নেওয়া। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন এবং আমাদের ইবাদত কবুল করুন।

আপনার মতামত লিখুন :