মানুষের জীবনে বিপদ আপদ আসবেই, কিন্তু সেই কঠিন সময়ে কার কাছে সাহায্য চাইতে হবে এবং কীভাবে চাইতে হবে তা ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে। যখন চারদিকের সব দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন কেবল আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাস এবং জীবনের গোপন নেক আমলগুলোই মুক্তির মাধ্যম হতে পারে। রাসুলুল্লাহ ﷺ পূর্ববর্তী উম্মতদের জীবনের এমন এক অলৌকিক ও সত্য ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত বিশ্বাসীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। এই কাহিনীটি মূলত আমাদের ইখলাস বা কাজের একনিষ্ঠতা এবং সৎ কর্মের গুরুত্বকে ফুটিয়ে তোলে।
প্রাচীনকালে তিনজন ব্যক্তি পথ চলছিলেন। হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি শুরু হলে তারা পাহাড়ের একটি গুহায় আশ্রয় নেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পাহাড়ের উপর থেকে একটি বিশাল পাথর খসে পড়ে গুহার মুখটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়। তারা এমন এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন যেখানে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না। সেই জনশূন্য পাহাড়ে পাথরটি সরানোর মতো শারীরিক শক্তি তাদের কারোরই ছিল না। এমন সংকটময় মুহূর্তে তারা সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ জীবনে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আমলটির উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।
প্রথম ব্যক্তি তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের প্রতি চরম আনুগত্য ও সেবার কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি প্রতিদিন আমার সন্তানদের আগে আমার বৃদ্ধ বাবা-মাকে দুধ পান করাতাম। একদিন বাড়ি ফিরতে দেরি হওয়ায় তারা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু আমি তাদের না জাগিয়ে দুধের পাত্র হাতে সারারাত দাঁড়িয়ে ছিলাম। হে আল্লাহ! আমি যদি কেবল আপনার সন্তুষ্টির জন্য এটি করে থাকি, তবে পাথরটি সরিয়ে দিন। এরপর পাথরটি সামান্য সরে গেল। দ্বিতীয় ব্যক্তি তাঁর চারিত্রিক পবিত্রতার কথা উল্লেখ করলেন। তিনি এক সুন্দরী মহিলার প্রতি আসক্ত হয়েও কেবল আল্লাহর ভয়ে পাপাচার থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলেন। তাঁর দোয়ার পর পাথরটি আরও একটু সরে গেল।
তৃতীয় ব্যক্তি তাঁর আমানতদারিতার কথা তুলে ধরলেন। তিনি একজন শ্রমিকের পাওনা মজুরি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে বিনিয়োগ করে বিশাল সম্পদে রূপান্তর করেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেই শ্রমিক ফিরে আসলে সবটুকু তাকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহ! আমি যদি আপনার ভয়েই এই আমানত রক্ষা করে থাকি, তবে আমাদের মুক্তির ব্যবস্থা করুন। তাঁর এই দোয়ার পর পাথরটি সম্পূর্ণ সরে গেল এবং তারা তিনজনই নিরাপদে বেরিয়ে আসলেন (সহীহ আল-বুখারী, ২২১৫)।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের লোকচক্ষুর অন্তরালে করা গোপন ইবাদত আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। যখন কেউ কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের স্বার্থ বা প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেয়, আল্লাহ তায়ালা তখন প্রকৃতির নিয়ম ভেঙেও তাকে সাহায্য করেন। বিপদে পড়ে বিচলিত না হয়ে অতীতের নেক আমল স্মরণ করে আল্লাহর উসিলা ধরা বৈধ ও ফলপ্রসূ। মা-বাবার সেবা, চারিত্রিক পবিত্রতা এবং মানুষের আমানত রক্ষা করা—এই তিনটি গুণ একজন মানুষকে আল্লাহর কত নিকটবর্তী করতে পারে, এই হাদিসটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আমাদের উচিত জীবনে অন্তত এমন কিছু আমল জমিয়ে রাখা, যা কেয়ামতের কঠিন দিনে বা দুনিয়ার কোনো বিপদে আল্লাহর দরবারে পেশ করা যায় (সহীহ মুসলিম, ২৭৪৩)।

আপনার মতামত লিখুন :