পার্থিব সম্পদের মোহ মানুষকে অন্ধ করে দেয়, কিন্তু ইমানদার ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতার ভয় করে। আমাদের সমাজে আজ যখন এক ইঞ্চি জমি বা সামান্য টাকার জন্য মানুষ একে অপরের রক্ত ঝরাতে দ্বিধা করে না, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণিত পূর্ববর্তী উম্মতদের এক সত্য ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় প্রকৃত সততা কাকে বলে। এই গল্পটি কেবল একটি কাহিনী নয়, বরং এটি মানুষের নৈতিকতা ও আমানতদারীর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বর্ণনা করেছেন, বনী ইসরাঈলের এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে একখণ্ড জমি ক্রয় করলেন। জমিটি বুঝে পাওয়ার পর নতুন মালিক যখন তা চাষাবাদ বা খনন করতে শুরু করলেন, তখন মাটির নিচ থেকে হঠাৎ একটি সোনার কলস বেরিয়ে এল। কলসটি ছিল দামী স্বর্ণমুদ্রায় ঠাসা। সাধারণ মানুষ হলে হয়তো একে পরম ভাগ্য বলে মেনে নিত এবং নিজের কাছে গোপন রাখত। কিন্তু সেই ব্যক্তি ছিলেন অত্যন্ত মুত্তাকী ও ইমানদার। তিনি তৎক্ষণাৎ কলসটি নিয়ে বিক্রেতার কাছে ছুটে গেলেন এবং বললেন, ভাই! আপনার এই স্বর্ণের কলসটি বুঝে নিন। আমি আপনার কাছ থেকে শুধু জমিটি কিনেছি, এর ভেতরে থাকা কোনো সম্পদ আমি কিনিনি। তাই এই স্বর্ণের মালিক আপনি, আমি নই।
জমির পূর্বতন মালিকও ছিলেন ঠিক তেমনি এক মহান চরিত্রের মানুষ। তিনি উত্তর দিলেন, আমি যখন আপনার কাছে জমিটি বিক্রি করেছি, তখন জমির ভেতরে যা কিছু আছে তার সবকিছুসহই বিক্রি করেছি। সুতরাং এই স্বর্ণের ওপর আমার কোনো অধিকার নেই। এটি এখন আপনারই সম্পদ। দুই ব্যক্তির মধ্যে অদ্ভুত এক বিবাদ শুরু হলো। সাধারণত মানুষ সম্পদ পাওয়ার জন্য বিবাদ করে, কিন্তু তারা একে অপরকে সম্পদ বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য বিবাদে লিপ্ত হলেন। শেষ পর্যন্ত তারা বিষয়টি মিমাংসার জন্য একজন বিচারকের কাছে গেলেন।
বিচারক এই দুই ব্যক্তির সততা দেখে অবাক হলেন। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের কি কোনো সন্তান আছে? একজন বললেন আমার একটি ছেলে আছে, অন্যজন বললেন আমার একটি মেয়ে আছে। বিচারক তখন বিজ্ঞোচিত ফয়সালা দিয়ে বললেন, আপনারা আপনাদের ছেলে ও মেয়ের বিবাহ দিন এবং এই স্বর্ণের কিছু অংশ তাদের বিয়েতে ব্যয় করুন আর বাকিটা আল্লাহর পথে সদকা করে দিন (সহীহ আল-বুখারী, ৩৪৭২)। এইভাবে তাদের সততার কারণে একটি সুন্দর ও বরকতময় বন্ধন তৈরি হলো এবং সম্পদটি হালাল উপায়েই ব্যবহৃত হলো।
এই হাদিসটি আমাদের শিক্ষা দেয় যে, হালাল উপার্জনের প্রতি মুমিনের কতটা যত্নশীল হওয়া উচিত। অন্যের সম্পদ ভোগ করার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই, বরং নিজের হকটুকু বুঝে পাওয়াই হলো প্রকৃত প্রশান্তি। যখন কোনো জাতি বা সমাজ থেকে আমানতদারী হারিয়ে যায়, তখন সেখানে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা নেমে আসে। কিন্তু যারা এই পৃথিবীর তুচ্ছ সম্পদের চেয়ে পরকালের মুক্তিকে প্রাধান্য দেয়, আল্লাহ তায়ালা তাদের জন্য গায়েবি সাহায্যের ফয়সালা করেন (সহীহ মুসলিম, ১৭২১)। বর্তমান যুগে আমাদের উচিত লেনদেন ও ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে এই দুই ব্যক্তির মতো সৎ হওয়া, যেন আমাদের সম্পদ ও জীবনে আল্লাহর রহমত ও বরকত বজায় থাকে।

আপনার মতামত লিখুন :