বৃহস্পতিবার, ০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২

বিচার দিবসের মালিকানা: পরকাল ও আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

নিউজ ডেস্ক ফেব্রুয়ারি ৫, ২০২৬, ০১:২৮ এএম
বিচার দিবসের মালিকানা: পরকাল ও আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের স্বরূপ

বিচার দিবসে মহান আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে, যেখানে প্রতিটি আত্মা তার কর্মের হিসাব দিতে বাধ্য থাকবে।

পবিত্র কোরআনের প্রথম সূরা আল-ফাতিহার চতুর্থ আয়াতে মহান আল্লাহ নিজেকে ‍‍`মালিকি ইয়াওমিদ্দিন‍‍` বা বিচার দিবসের মালিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এই ঘোষণাটি মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক অমোঘ সত্য। এর পূর্ববর্তী আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর অসীম রহমত ও করুণার কথা বর্ণনা করেছেন, আর ঠিক তার পরেই বিচার দিবসের কথা উল্লেখ করে মানুষের মনে ভয় ও আশার এক অপূর্ব ভারসাম্য তৈরি করেছেন। এই আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহ কেবল এই জগতের লালনকর্তা ও দয়াময় প্রতিপালকই নন, বরং তিনি সেই চূড়ান্ত দিবসের একমাত্র বিচারক ও অধিপতি, যেদিন প্রতিটি কর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হবে। পরকাল ও জবাবদিহিতার এই ধারণাটিই মূলত একজন মানুষের নৈতিক জীবন গঠনের প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে।

‍‍`ইয়াওমুদ্দিন‍‍` শব্দটির বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, আরবী ভাষায় ‍‍`দীন‍‍` শব্দের অর্থ এখানে প্রতিফল বা কর্মফল। অর্থাৎ এটি এমন এক দিন, যেদিন ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সূরা আন-নূরের ২৫ নম্বর আয়াতে এই বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, সেদিন আল্লাহ লোকদের প্রকৃত কর্মফল পূর্ণ করে দেবেন (সূরা আন-নূর, ২৫)। দুনিয়াতে মানুষ নানাভাবে সুযোগ পায়, অনেক সময় অন্যায় করেও পার পেয়ে যায় কিংবা ভালো কাজের স্বীকৃতি পায় না। কিন্তু বিচার দিবসে আল্লাহর সূক্ষ্ম বিচারে কোনো কিছুই বাদ পড়বে না। প্রতিটি অণু পরিমাণ কাজেরও হিসাব সেদিন নেওয়া হবে। এই দিবসের মালিকানা কেবল আল্লাহর হাতে থাকার অর্থ হলো, সেদিন কোনো সুপারিশকারী বা কোনো পার্থিব শক্তি আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত সামান্যতম প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

বিচার দিবসের প্রকৃত ভয়াবহতা ও গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের অন্যত্রও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সূরা আল-ইনফিতারে আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন করেছেন, বিচারের দিনটি কী, তা কিসে আপনাকে জানাবে? পুনরায় বলা হয়েছে, কিসে আপনাকে জানাবে বিচারের দিনটি কী? এরপর এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তা এমন একটি দিন, যেদিন কেউই নিজের রক্ষার জন্য কোনো সাহায্যকারী পাবে না এবং সমগ্র ব্যাপার নিরঙ্কুশভাবে আল্লাহর ইখতিয়ারভুক্ত হবে (সূরা আল-ইনফিতার, ১৭-১৯)। এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, পরকালে মানুষের অসহায়ত্ব হবে চূড়ান্ত এবং আল্লাহর ক্ষমতা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দুনিয়াতে যারা নিজেদের ক্ষমতা বা সম্পদের দাপট দেখায়, সেদিন তাদের সকল দম্ভ চূর্ণ হয়ে যাবে। হাশরের ময়দানে যখন আল্লাহর ঘোষণা আসবে যে, আজ রাজত্ব কার? তখন সমস্ত সৃষ্টিজগত নিথর হয়ে যাবে এবং উত্তর আসবে যে, রাজত্ব কেবল মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহর (সূরা আল-গাফির, ১৬)।

আল্লাহকে ‍‍`বিচার দিবসের মালিক‍‍` হিসেবে মেনে নেওয়ার একটি বড় প্রভাব হলো মানুষের ইহকালীন জীবন সংশোধন। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে, তার প্রতিটি কাজের জন্য একদিন মহান মালিকের সামনে দাঁড়াতে হবে, তখন সে জুলুম, মিথ্যা ও পাপাচার থেকে বিরত থাকে। আজ পৃথিবীতে অনেকে আল্লাহর দেয়া স্বাধীনতাকে অপব্যবহার করে স্বেচ্ছাচারিতা চালায়, কিন্তু এই আয়াতে তাদের জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে যে, এই স্বাধীনতা চিরস্থায়ী নয়। কিয়ামতের প্রথম শিঙায় ফুঁ দেওয়ার দিন থেকেই আল্লাহর এই নিরঙ্কুশ মালিকানা দৃশ্যমানভাবে কার্যকর হবে (সূরা আল-আনআম, ৭৩)। সেদিন কোনো ধোঁকাবাজি বা লবিং চলবে না, বরং কেবল সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে ফয়সালা হবে। যারা দুনিয়াতে মজলুম ছিল, সেদিন তারা ন্যায়বিচার পাবে এবং যারা জালিম ছিল, তারা তাদের প্রাপ্য শাস্তি ভোগ করবে।

পরিশেষে বলা যায়, ‍‍`মালিকি ইয়াওমিদ্দিন‍‍` মুমিনকে যেমন আল্লাহর শাস্তির ব্যাপারে ভীত করে, তেমনি তাঁর ন্যায়বিচারের প্রতি আশ্বস্তও করে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জীবন কেবল এই দুনিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর পরে এক অনন্ত জীবন অপেক্ষা করছে। সূরা ফাতিহার এই আয়াতটি প্রতিদিন সালাতে বারবার পাঠ করার মাধ্যমে আমরা মূলত নিজেদের এই অঙ্গীকারই নবায়ন করি যে, আমরা সেই মালিকের সামনে জবাবদিহিতার জন্য প্রস্তুত হচ্ছি। এই সচেতনতা যদি সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে পৃথিবী থেকে অন্যায় ও অবিচার বহুলাংশে হ্রাস পাবে। মহান আল্লাহর সেই চূড়ান্ত বিচারের দিনে তাঁর বিশেষ অনুগ্রহ ও রহমত লাভ করাই হোক আমাদের জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ লক্ষ্য।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

কোরআন বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!