শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২

ভালোবাসা দিবসের আড়ালে নৈতিক পতন ও ইসলামের চিরন্তন সমাধান

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০১:০৩ এএম
ভালোবাসা দিবসের আড়ালে নৈতিক পতন ও ইসলামের চিরন্তন সমাধান

নৈতিকতা ও ঈমান রক্ষার আহ্বান

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে বর্তমান বিশ্বের এক বিশাল অংশ তথাকথিত ভালোবাসা দিবস পালনের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে। ক্যালেন্ডারের পাতায় ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখটি আধুনিক সংস্কৃতির চাপে এমন এক রূপ ধারণ করেছে যা কেবল নৈতিক স্খলনই নয় বরং একটি প্রজন্মের আদর্শিক ভিত্তিকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের এই নদীমাতৃক বাংলাদেশেও এই সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে অত্যন্ত ভয়াবহভাবে। ভালোবাসা শব্দটি মূলত একটি পবিত্র এবং মানবিক অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ হলেও বর্তমান সময়ে একে একটি বাণিজ্যিক এবং অশ্লীল পণ্যে রূপান্তরিত করা হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে এই দিনটিকে ঘিরে যে উন্মাদনা দেখা যায় তা অনেক ক্ষেত্রে সীমা লঙ্ঘন করে পাপাচারের রূপ নেয়। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই আমরা দেখতে পাই এই বিশেষ দিনগুলোতে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার হার বৃদ্ধি পায়। অবাধ মেলামেশার সুযোগে একদল মানুষ যেমন লিপ্ত হচ্ছে জঘন্য অপরাধে তেমনি সামাজিক শৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। এই প্রবণতা কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিতেই প্রশ্নবিদ্ধ নয় বরং আমাদের হাজার বছরের লালিত দেশীয় সংস্কৃতির সাথেও সাংঘর্ষিক।

ইসলামী জীবনদর্শনে মানুষের প্রতিটি কাজের একটি সুনির্দিষ্ট সীমানা এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে মমতা ও ভালোবাসা দান করেছেন। তবে এই ভালোবাসা হতে হবে পবিত্র এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। যখনই কোনো সমাজ বা জাতি তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া বিধানকে উপেক্ষা করে বিজাতীয় সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ শুরু করে তখনই সেখানে বিপর্যয় নেমে আসে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ব্যভিচার বা যিনার ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর এবং স্পষ্ট সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। সূরা বনী ইসরাঈলের ৩২ নম্বর আয়াতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে তোমরা যিনার কাছেও যেও না কারণ এটি অত্যন্ত অশ্লীল কাজ এবং খুবই মন্দ পথ। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো আল্লাহ কেবল যিনা করতে নিষেধ করেননি বরং যিনার পথে নিয়ে যেতে পারে এমন প্রতিটি মাধ্যম বা পরিবেশ থেকেও দূরে থাকতে বলেছেন। ১৪ ফেব্রুয়ারির মতো দিনগুলোতে যে ধরনের পরিবেশ তৈরি করা হয় তা মূলত মানুষকে সেই নিষিদ্ধ কাজের দিকেই প্ররোচিত করে।

আজকের সমাজে এই অবক্ষয়ের ফলে যে ভয়াবহ চিত্র আমরা দেখতে পাই তার মধ্যে অন্যতম হলো অবৈধ সম্পর্কের কারণে সৃষ্ট অপরাধপ্রবণতা। তথাকথিত আধুনিকতার নামে নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা অনেক সময় নিষ্ঠুর পরিণতির দিকে মোড় নেয়। গণমাধ্যমগুলোতে প্রায়শই খবর আসে যে বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গিয়ে কোনো তরুণী লাঞ্ছিত হয়েছেন অথবা প্রেমের অভিনয়ে ডেকে নিয়ে কাউকে হত্যা করা হয়েছে। এর বাইরেও লোকচক্ষুর আড়ালে ডাস্টবিনে ফেলে যাওয়া নবজাতকের নিথর দেহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে আল্লাহর বিধান অমান্য করার সামাজিক মূল্য কতটা চড়া হতে পারে। ইসলাম কেন পর্দা এবং নারী-পুরুষের মেলামেশায় নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করেছে তার উত্তর এই সামাজিক অস্থিরতাগুলোর মধ্যেই নিহিত। যখন একজন ব্যক্তি তার প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং পরকালীন জবাবদিহিতার কথা ভুলে যায় তখন তার দ্বারা যেকোনো অমানবিক কাজ করা সম্ভব হয়ে ওঠে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিনা বা ব্যভিচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। সহীহ আল-বুখারীর একটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে চোখের যিনা হলো অন্যায়ভাবে দেখা এবং কানের যিনা হলো পাপাচারের কথা শোনা। এমনকি মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো যখন কোনো হারাম কাজের দিকে ধাবিত হয় তখন সেটিও যিনার অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। বর্তমান সময়ের ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার এই প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করছে। তরুণরা মনে করছে যে বিয়ের আগে কারো সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা হয়তো এক প্রকার আধুনিকতা বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে এটি মূলত শয়তানের একটি ফাঁদ। শয়তান মানুষকে ধীরে ধীরে ছোট ছোট পাপের মাধ্যমে বড় ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। যখন সমাজে এই ধরনের অশ্লীলতা প্রকাশ্যে চলে আসে তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং দুরারোগ্য ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা আগে কখনো ছিল না।

যিনা বা ব্যভিচারের শাস্তি দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় জগতেই অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি দীর্ঘ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি স্বপ্নে একদল উলঙ্গ নারী ও পুরুষকে আগুনের গর্তে জ্বলতে দেখেছেন। জিবরাঈল আলাইহিস সালাম তখন তাকে জানিয়েছিলেন যে এরা হলো সেইসব মানুষ যারা দুনিয়াতে ব্যভিচারে লিপ্ত ছিল। পরকালীন এই কঠিন শাস্তির পাশাপাশি দুনিয়াতেও ব্যভিচারী ব্যক্তি তার আত্মিক শান্তি এবং বরকত হারিয়ে ফেলে। মানুষের চরিত্রই হলো তার সবচেয়ে বড় সম্পদ আর যখন সেই চরিত্রে কালিমা লিপ্ত হয় তখন তার সামাজিক মর্যাদা বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ইসলাম মানুষের এই মর্যাদাকে রক্ষা করার জন্য বিবাহের মতো একটি পবিত্র এবং শক্তিশালী মাধ্যম উপহার দিয়েছে। ভালোবাসা যদি করতেই হয় তবে তা বিয়ের মাধ্যমে হালাল উপায়ে করতে হবে। ইসলাম ভালোবাসাকে অস্বীকার করে না বরং একে দায়িত্বশীলতা এবং সম্মানের ফ্রেমে আবদ্ধ করে।

প্রাচ্যের সমাজগুলোতে আজ যে ‍‍`ডেটিং‍‍` বা ‍‍`গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড‍‍` সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে তা মূলত পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করার একটি নীলনকশা। ইসলামে কোনো গোপন প্রেমের সম্পর্ক বা উপপতি গ্রহণের সুযোগ নেই। সূরা আন-নিসার ২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা সতীসাধ্বী নারীদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন তারা যেন ব্যভিচারিণী না হয় এবং গোপন বন্ধু বা উপপতি গ্রহণকারিণীও না হয়। একইভাবে পুরুষদের ক্ষেত্রেও এই বিধান কার্যকর। একটি সুস্থ সমাজ গড়ার জন্য পরিবার হলো প্রথম পাঠশালা আর সেই পরিবারের ভিত্তি যদি পাপাচারের ওপর স্থাপিত হয় তবে সেখান থেকে কোনো আদর্শ প্রজন্ম আশা করা যায় না। সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহীনদের জীবনেও ভালোবাসার অনন্য উদাহরণ রয়েছে যা ছিল অত্যন্ত মার্জিত এবং আল্লাহর ইবাদতের শামিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের প্রতি যে মমতা এবং শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন তা কেয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে।

বর্তমান প্রজন্মের উচিত পশ্চিমা সংস্কৃতির অন্ধ মোহ ত্যাগ করে নিজেদের শিকড়ের দিকে ফিরে আসা। ১৪ ফেব্রুয়ারি বা এই ধরনের দিবসগুলো মূলত পুঁজিবাদী বাজারের একটি চক্রান্ত যেখানে মানুষের অনুভূতিকে পুঁজি করে ব্যবসা করা হয়। একজন মুসলিম হিসেবে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ রয়েছে। আমাদের উচিত আমাদের সন্তানদের মধ্যে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি জাগ্রত করা। যখন কোনো তরুণের অন্তরে এই বিশ্বাস গেঁথে যাবে যে অন্ধকার ঘরে কেউ না থাকলেও আমার রব সবকিছু দেখছেন তখনই সে এই ধরনের পাপাচার থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে। হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা আমাদের জন্য এক বিশাল শিক্ষা যেখানে তিনি চরম প্রলোভনের মুখেও আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছিলেন এবং নিজের চরিত্র রক্ষা করেছিলেন। সেই চারিত্রিক দৃঢ়তাই আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

পরিশেষে এটিই প্রতীয়মান হয় যে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা ও অশ্লীলতা আজ সর্বত্র বিরাজমান তা থেকে বাঁচতে হলে আমাদের পুনরায় কুরআনের শিক্ষার দিকে ফিরে আসতে হবে। আমাদের ঘরগুলোকে করতে হবে দ্বীনি চর্চার কেন্দ্রবিন্দু। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে তাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে বা কার সাথে মিশছে সে বিষয়ে। অশ্লীলতা কেবল একজন ব্যক্তিকে নয় বরং পুরো সমাজকে পচে যাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়। আসুন আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি যে আমরা কোনো হারাম সম্পর্কে জড়াব না এবং বিজাতীয় কোনো অপসংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেব না। আমাদের ভালোবাসা হোক জান্নাতমুখী এবং আমাদের জীবন হোক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে এবং আমাদের যুবসমাজকে সকল প্রকার অশ্লীলতা ও পাপাচার থেকে রক্ষা করুন এবং একটি সুন্দর শান্তিময় সমাজ গড়ার তৌফিক দান করুন।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

লাইফস্টাইল বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!