রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ৩ ফাল্গুন ১৪৩২

গাজায় তাবুর আগুনে দুই শিশুর মৃত্যু ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি হানা

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ১০:৪২ পিএম
গাজায় তাবুর আগুনে দুই শিশুর মৃত্যু ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি হানা

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবেতর জীবনযাপন করা বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জীবনে নেমে এসেছে এক নতুন ট্র্যাজেডি। দেইর আল-বালাহ অঞ্চলে একটি তাঁবুতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দুই শিশু নিহত হয়েছে। গত বুধবার রাতে ঘটা এই ঘটনায় শিশুদের মা এবং অপর এক শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। গাজার সাধারণ মানুষের জন্য এখন নিরাপদ আশ্রয়ের কোনো জায়গাই অবশিষ্ট নেই। ইসরায়েলি বাহিনীর অব্যাহত হামলার মুখে ঘরবাড়ি হারিয়ে তাবু গেড়ে থাকা পরিবারগুলো এখন আগুনের ঝুঁকিতেও প্রাণ হারাচ্ছে।

নিহত শিশুদের মধ্যে বড় বোন শাহদ মাহমুদ আল-মেদহুনের বয়স ১৬ বছর। সে ঘটনাস্থলেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে প্রাণ হারায়। তার দুই বছর বয়সী ছোট ভাই আদমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তাদের মা ৪৩ বছর বয়সী এনাম আল-মেদহুন এবং এক বছর বয়সী বোন সিদরা বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, মা যখন সন্তানদের জন্য খাবার তৈরি করছিলেন, তখন রান্নার আগুন থেকে এই সূত্রপাত হয়। কাপড় ও প্লাস্টিকের তৈরি তাবুগুলো মুহূর্তের মধ্যেই দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে এবং পাশে থাকা আরও একটি তাবু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। জ্বালানি ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটের কারণে খোলা আগুনে রান্না করতে বাধ্য হওয়া ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি একটি নিত্যদিনের মরণফাঁদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গাজা উপত্যকার ভয়াবহ পরিস্থিতির পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমেও সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। দক্ষিণ হেব্রনের মাসাফের ইয়াত্তায় ১১ বছর বয়সী খলিল আয়মান রাবাই নামে এক শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর ফেলে যাওয়া একটি অবিস্ফোরিত বস্তু বা সন্দেহজনক বস্তুর বিস্ফোরণে শিশুটি আহত হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, শিশুটি তার বাড়ির সামনে খেলার সময় এই বিস্ফোরণ ঘটে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই দিন আগেই ইসরায়েলি সেনারা ওই এলাকায় অভিযান চালিয়েছিল এবং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন বিপজ্জনক বস্তু ফেলে রেখে যায়। এছাড়া বানি নাঈম এলাকায় সাবের হামদান নামে এক ব্যক্তিকে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা বেদম মারধর করেছে। বসতি স্থাপনকারীরা তার ঘরে ঢুকে কোনো উস্কানি ছাড়াই হামলা চালায়, যার ফলে তার মাথায় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মক আঘাত লাগে।

ইসরায়েলি আগ্রাসনের পরিধি এখন কেবল ফিলিস্তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে গত বুধবার দেশটির দক্ষিণ কুনেইত্রা প্রদেশে বড় ধরনের স্থল অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। সিরিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ব গণমাধ্যম ‍‍`সানা‍‍` জানিয়েছে, ১৫টি সামরিক যান এবং প্রায় ৬০ জন সৈন্য উফানিয়া গ্রামে প্রবেশ করে। তারা গ্রামের প্রবেশপথগুলো বন্ধ করে দেয় এবং সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে আলোক সংকেত বা ফ্লেয়ার নিক্ষেপ করে। এই ঘটনার মাত্র একদিন আগেই কুনেইত্রা থেকে এক রাখাল যুবককে ধরে নিয়ে যায় ইসরায়েলি বাহিনী। ২০২৪ সালের শেষ দিকে সিরিয়ার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল বাফার জোন বা অসামরিক এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে শুরু করেছে। সিরীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই ধরনের অনুপ্রবেশ দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং স্থিতিশীলতা আনার প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

গাজা ও সিরিয়ার এই অস্থিরতা বিশ্ব সম্প্রদায়কে পুনরায় মধ্যপ্রাচ্যের নাজুক পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। একদিকে গাজার তাবুগুলোতে মানুষ পুড়ে মরছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সিরিয়ার ভূখণ্ডে হানা দিচ্ছে ইসরায়েল। গাজায় অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার ফলে লাখ লাখ মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে তাবুতে বসবাস করছে। শীতকাল ও বৃষ্টির মৌসুমে প্লাস্টিক ও কাপড়ের এসব তাবু যেমন ঠান্ডার হাত থেকে বাঁচাতে পারছে না, তেমনি অসাবধানতাবশত রান্নার আগুন থেকে হওয়া ছোট একটি দুর্ঘটনাও মুহূর্তেই মৃত্যুপুরী বানিয়ে ফেলছে পুরো এলাকা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজায় জরুরি ত্রাণ সহায়তা ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার দাবি জানালেও অবরোধের কারণে জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম পৌঁছাতে পারছে না।

বর্তমানে গাজার প্রতিটি পরিবারই কোনো না কোনো ট্র্যাজেডির শিকার। আল-মেদহুন পরিবারের গল্পটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি গাজার হাজার হাজার পরিবারের বর্তমান চিত্র। যেখানে মা তার সন্তানদের জন্য শেষবেলার খাবার তৈরি করতে গিয়ে নিজের সন্তানদের হারালেন। দেইর আল-বালাহর সেই প্রতিবেশী বলছিলেন, "তাবুগুলো এমন উপাদানে তৈরি যে আগুন লাগলে নেভানোর কোনো উপায় থাকে না। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব শেষ হয়ে যায়।" এই অগ্নিকাণ্ড গাজার জ্বালানি সংকটের প্রত্যক্ষ ফল। বিদ্যুৎ নেই, রান্নার গ্যাস নেই—ফলে মানুষ কাঠ বা অনিরাপদ উপায়ে আগুন জ্বালাতে বাধ্য হচ্ছে।

এদিকে অধিকৃত জেরুজালেমের জাবা সামরিক চেকপোস্টের কাছে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় আরেক ফিলিস্তিনি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, তারা আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে। ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এখন এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, মানুষ নিজেদের ঘরের ভেতরেও নিরাপদ বোধ করছে না। মাসাফের ইয়াত্তার বাসিন্দারা বলছেন, ইসরায়েলি সেনারা যাওয়ার সময় যেসব অস্ত্র বা অবিস্ফোরিত গোলা ফেলে যায়, তা শিশুদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ। খলিল রাবাইয়ের পরিবার এখন তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছে, তবে তার শরীরে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে তা সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে গাজায় মানবিক বিপর্যয়, অন্যদিকে সিরিয়া ও পশ্চিম তীরে সামরিক উত্তেজনা। গাজার তাবুর আগুন কেবল কাপড় পোড়ায়নি, বরং বিশ্ব বিবেককেও দগ্ধ করছে। যে শিশুদের স্কুলে থাকার কথা ছিল বা নিরাপদ আশ্রয়ে খেলার কথা ছিল, তারা আজ আগুনের লেলিহান শিখায় প্রাণ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলের নির্লিপ্ততা এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। যতদিন পর্যন্ত এই দখলদারি এবং অবরোধের অবসান না ঘটবে, ততদিন এ ধরনের ট্র্যাজেডি পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!