সময়ের অনিবার্য পরিক্রমায় আমাদের জীবনে আবারও উপস্থিত হয়েছে পবিত্র শাবান মাস। রজব মাসের বিদায় এবং শাবান মাসের এই আগমন মূলত মুমিনদের হৃদয়ে রামাদানের আগমনী বার্তা পৌঁছে দেয়। আকাশের কোণে শাবানের নতুন চাঁদ উদিত হওয়ার সাথে সাথেই আত্মশুদ্ধি এবং ইবাদতের এক নতুন আবহ তৈরি হয়। ইসলামী জীবনবিধানে এই মাসটির গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এটি হলো সেই সময় যখন একজন মুসলিম নিজেকে আসন্ন রামাদানের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রস্তুত করার চূড়ান্ত সুযোগ পান। পূর্ববর্তী যুগের সালাফগণ একটি চমৎকার উপমা ব্যবহার করতেন। তারা বলতেন রজব হলো জমিনে বীজ বপন করার মাস, শাবান হলো সেই ক্ষেতে পানি সেচ দেওয়ার মাস এবং রামাদান হলো ফসল ঘরে তোলার মাস। এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, শাবান মাসকে অবহেলায় কাটিয়ে দিলে রামাদানের পূর্ণাঙ্গ বরকত অর্জন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অথচ বর্তমান সমাজে অনেকেই এই মূল্যবান সময়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন থাকেন এবং জাগতিক ব্যস্ততায় দিনাতিপাত করেন।
শাবান মাসের আমল সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই আসে নফল সিয়ামের কথা। রাসূলুল্লাহ (সা.) এই মাসে এত বেশি নফল রোজা রাখতেন যা অন্য কোনো মাসে দেখা যেত না। এর পেছনে একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে। সায়্যিদুনা উসামা বিন জায়েদ (রা.) একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে প্রশ্ন করেছিলেন যে তিনি কেন শাবান মাসে এত অধিক পরিমাণ রোজা রাখেন। উত্তরে রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছিলেন, এটি এমন একটি মাস যা রজব এবং রামাদানের মধ্যবর্তী, অথচ মানুষ এই মাসটি সম্পর্কে উদাসীন থাকে; এটি এমন একটি মাস যেই মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে বান্দার আমলনামা ওত্থাপন করা হয়, তাই আমি পছন্দ করি যে, আমার আমলনামা যখন আল্লাহর কাছে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজাদার অবস্থায় থাকি (সুনানে নাসাঈ, ২৩৫৭)। এই হাদিসটি মুমিনদের জন্য একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা যে, বার্ষিক আমলনামা পেশ করার এই অত্যন্ত সংবেদনশীল মুহূর্তে নিজেকে ইবাদতে মশগুল রাখা কতটা জরুরি।
নবীজির এই আমলটি তাঁর পারিবারিক জীবনেও গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা (রা.) নবীজির ইবাদতের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান মাসের চেয়ে বেশি অন্য কোনো মাসে নফল রোজা রাখতে দেখিনি, তিনি যেন পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন (সহীহ আল-বুখারী, ১৯৬৯)। একইভাবে উম্মুল মুমিনীন উম্মে সালামা (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে শাবান ও রামাদান ছাড়া অন্য কোনো দুই মাস টানা রোজা রাখতে দেখিনি (সুনানে তিরমিজি, ৭৩৬)। চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এর যৌক্তিকতা রয়েছে। রামাদানে ত্রিশ দিন একটানা রোজা রাখার জন্য শরীরকে প্রস্তুত করতে শাবান মাসের নফল রোজাগুলো এক ধরনের মহড়া হিসেবে কাজ করে। হঠাৎ করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন হলে অনেকেই শারীরিক ক্লান্তিতে ভোগেন, কিন্তু শাবান মাস থেকে রোজা রাখার অভ্যাস থাকলে রামাদানের ফরজ রোজাগুলো অত্যন্ত সহজে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করা সম্ভব হয়।
রোজার পাশাপাশি দৈনন্দিন সালাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ প্রদান করা শাবান মাসের অন্যতম প্রধান দাবি। জীবনের নানা ব্যস্ততায় অনেক সময় আমাদের সালাতে একাগ্রতা বা খুশুখুজু নষ্ট হয়ে যায়। মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে তাকবীরে উলার সহিত সালাত আদায় করার অভ্যাস যদি শিথিল হয়ে থাকে, তবে শাবান মাস হলো সেই ত্রুটি শুধরে নেওয়ার মোক্ষম সময়। রামাদান মাসে দীর্ঘ তারাবীহ এবং কিয়ামুল লাইল আদায় করতে হয়, যার জন্য শারীরিক স্থৈর্য এবং মানসিক প্রশান্তি অপরিহার্য। এখন থেকেই যদি পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে ধীরস্থিরতা বজায় রাখার চর্চা না করা হয়, তবে রামাদানের দীর্ঘ সালাতগুলো অনেকের কাছেই কষ্টকর মনে হতে পারে। সালাত হলো স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সরাসরি কথোপকথন। এই কথোপকথনে আন্তরিকতা ফিরিয়ে আনতে নফল সালাতের পরিমাণ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত ফলপ্রসূ একটি পদক্ষেপ।
কোরআন তিলাওয়াত শাবান মাসের আরেকটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। রামাদান হলো কোরআন নাজিলের মাস, তাই শাবান মাসকে বলা হয় কোরআনকে বরণ করে নেওয়ার মাস। ইসলামী ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, সালাফদের যুগে শাবান মাস শুরু হলেই চারদিকে কোরআন তিলাওয়াতের এক অভূতপূর্ব পরিবেশ তৈরি হতো। তারা এই মাসটিকে কারীদের মাস হিসেবে আখ্যায়িত করতেন। বিখ্যাত তাবেয়ী সালামা বিন কুহাইল (রহ.) এবং আমর বিন কাইস (রহ.) শাবান মাস শুরু হলে তাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বাণিজ্য এবং অন্যান্য জাগতিক কাজ সীমিত করে দিতেন এবং নিজেদেরকে সম্পূর্ণভাবে কোরআন তিলাওয়াতের জন্য নিয়োজিত করতেন। আমাদের সমাজেও অনেক গৃহকোণে কোরআনের কপিতে ধুলো জমে থাকে। শাবান মাস হলো সেই ধুলো ঝেড়ে ফেলে প্রতিদিন অর্থসহ অন্তত কিছু আয়াত তিলাওয়াত করার অভ্যাস গড়ে তোলার সময়, যাতে রামাদানে আমরা কোরআনের গভীরে প্রবেশ করে এর প্রকৃত শিক্ষা অনুধাবন করতে পারি।
রাতের নির্জনতায় মহান রবের দরবারে দাঁড়িয়ে কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করা রামাদানের প্রস্তুতির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। রামাদানে সাহরি খাওয়ার সুবাদে শেষ রাতে জাগরণ করা আমাদের নিয়মিত রুটিনে পরিণত হয়। কিন্তু এই অভ্যাসটি যদি শাবান মাস থেকেই শুরু করা যায়, তবে তা আত্মিক প্রশান্তির এক অনন্য স্তরে পৌঁছে দেয়। আল্লাহ তাআলা রাতের শেষ প্রহরে প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাকতে থাকেন, কে আছো ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব; কে আছো রিযিক অন্বেষণকারী, আমি তাকে রিযিক দেব (সহীহ বুখারি, ১১৪৫)। শেষ রাতের এই ঐশী আহ্বানে সাড়া দিয়ে দু চার রাকাত নফল সালাত আদায় করা এবং নিজের গুনাহের জন্য চোখের পানি ফেলা একজন মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই অভ্যাস রামাদানের সিয়াম ও কিয়ামের জন্য আমাদের আত্মাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।
সর্বোপরি, শাবান মাসে আমাদের সামগ্রিক জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা এবং অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা আবশ্যক। হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার এবং যাবতীয় পাপ থেকে নিজেকে মুক্ত করে এক পরিচ্ছন্ন হৃদয় নিয়ে রামাদানকে স্বাগত জানাতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি তার রবের সামনে দণ্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং নিজেকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাস (সূরা আন-নাযিআত, ৭৯:৪০-৪১)। নফসের এই কুপ্রবৃত্তি দমন করার সাধনা শাবান মাস থেকেই শুরু করতে হয়। দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ আমাদের আখেরাতের অনন্ত জীবন থেকে গাফেল করে রাখে। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই, আগামী রামাদান আমাদের নসিবে জুটবে কি না তা আমরা কেউ জানি না। তাই প্রতিটি মুহূর্তকে মহামূল্যবান মনে করে এখনই তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরে আসা প্রয়োজন। শাবান মাস আমাদেরকে সেই সুযোগই প্রদান করে, যেন আমরা নিজেদের প্রস্তুত করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারি।

আপনার মতামত লিখুন :