শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১ ফাল্গুন ১৪৩২

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বিতর্কিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাস

উম্মাহ কণ্ঠ ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬, ১০:২৫ পিএম
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে বিতর্কিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাস

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে নাগরিকত্বের প্রমাণ এবং ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে বিতর্কিত ‘সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট’ পাস হয়েছে। রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত নিম্নকক্ষে এই আইনটি অনুমোদনের ফলে এখন থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে ভোটারদের নিবন্ধনের সময় পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন সনদের মতো দালিলিক প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। গত ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বুধবার প্রতিনিধি পরিষদে ২১৮-২১৩ ভোটে বিলটি পাস হয়। ভোটাভুটির এই চিত্র ছিল সম্পূর্ণ দলীয় মেরুকরণ নির্ভর যেখানে মাত্র একজন ডেমোক্র্যাট সদস্য রিপাবলিকানদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি হেনরি কুয়েলার তার দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে এই আইনের পক্ষে সমর্থন জানান। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের দাবি এই আইনটি পাসের মাধ্যমে মূলত সাধারণ নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে যারা নিম্নবিত্ত বা যাদের কাছে নাগরিকত্বের তাৎক্ষণিক দালিলিক প্রমাণ নেই তাদের ভোটদান প্রক্রিয়াকে এটি বাধাগ্রস্ত করবে বলে তারা মনে করছেন।

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বিলটি পাসের পর একে সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বা কমন সেন্স হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে যুক্তরাষ্ট্রে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে গাড়ি চালাতে বা সরকারি সহায়তা পেতে যদি পরিচয়পত্রের প্রয়োজন হয় তবে ভোট দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে কেন তা প্রয়োজন হবে না। এই আইনের আওতায় ভোটারদের শুধু নিবন্ধনের সময়ই নয় বরং সরাসরি ভোটকেন্দ্রে গিয়েও ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র দেখাতে হবে। যারা ডাকযোগে বা মেইল-ইন ব্যালটে ভোট দেবেন তাদের ক্ষেত্রেও পরিচয়পত্রের অনুলিপি সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এ ছাড়া এই আইনের মাধ্যমে অঙ্গরাজ্যগুলোকে তাদের ভোটার তালিকা প্রতি মাসে যাচাই করার এবং অ-নাগরিকদের নাম বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই তথ্যগুলো যাচাই করার জন্য ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির তথ্যভাণ্ডার ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে যা অনেক মানবাধিকার কর্মীর মতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন।

হাউস মাইনোরিটি লিডার হাকিম জেফরিস এই বিলটিকে ভোটার দমনের একটি মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রে অ-নাগরিকদের ভোট দেওয়া বর্তমানে ফেডারেল আইনেই নিষিদ্ধ এবং এর জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। তারা মনে করছেন নতুন এই আইনটি কার্যকর হলে অন্তত ২ কোটি ১০ লাখ আমেরিকান নাগরিক ভোটাধিকার হারাতে পারেন যাদের কাছে পাসপোর্ট বা জন্মনিবন্ধন সনদ তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষিত নেই। বিশেষ করে বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে কারণ তাদের বর্তমান নাম এবং জন্ম সনদের নামের মধ্যে পার্থক্য থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ আমেরিকান নারীর জন্মনিবন্ধন সনদে থাকা নাম তাদের বর্তমান আইনগত নামের সাথে মেলে না। ডেমোক্র্যাটদের মতে সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনার ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে ন্যস্ত তবে এই আইনের মাধ্যমে রিপাবলিকানরা নির্বাচন ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করতে চাইছে যা অসাংবিধানিক।

প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাস হলেও সেনেটে এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে সেনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও কোনো বিতর্কিত আইন পাসের জন্য প্রয়োজনীয় ৬০টি ভোট তাদের কাছে নেই। ইতোমধ্যে রিপাবলিকান সেনেটর লিসা মারকোভস্কি এই আইনের বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে তিনি ফেডারেল সরকারের এই ধরণের হস্তক্ষেপ সমর্থন করেন না কারণ এটি অঙ্গরাজ্যগুলোর নিজস্ব নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে সেনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এই বিলটিকে ‘ডেড অন অ্যারাইভাল’ বা শুরুতেই মৃত বলে ঘোষণা করেছেন। তার মতে এটি মূলত ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে রিপাবলিকানদের একটি রাজনৈতিক কৌশল। উল্লেখ্য যে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে ২০২০ সালের নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে আসছেন যদিও তার স্বপক্ষে কোনো অকাট্য প্রমাণ মেলেনি। ট্রাম্পের এই বার্তার প্রতিধ্বনিই মূলত রিপাবলিকানদের এই নতুন আইনি পদক্ষেপে প্রতিফলিত হচ্ছে।

ভোটের শুদ্ধতা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে রিপাবলিকানরা যেখানে অনড় সেখানে জনমত জরিপ কিন্তু কিছুটা ভিন্ন কথা বলছে। পিউ রিসার্চ সেন্টার এবং গ্যালপের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৮৩ শতাংশ আমেরিকান নাগরিক ভোটদানের ক্ষেত্রে পরিচয়পত্র দেখানোর নিয়মকে সমর্থন করেন। এর মধ্যে ৭১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৮২ শতাংশ হিস্পানিক ভোটারও রয়েছেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের প্রধান আপত্তি হলো নাগরিকত্বের প্রমাণের জন্য দালিলিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে। তারা বলছেন ভোটার আইডি এবং ভোটার সাপ্রেশন বা দমন এক বিষয় নয়। বর্তমানে ওহিও এবং অ্যারিজোনার মতো কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এই ধরণের কঠোর নিয়ম থাকলেও ফেডারেল পর্যায়ে এটি কার্যকর করা হলে তা বড় ধরণের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের মাত্র কয়েক মাস আগে এই ধরণের আমূল পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা স্থানীয় নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হবে। সব মিলিয়ে সেভ আমেরিকা অ্যাক্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন চরম উত্তপ্ত এবং এর চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করছে সেনেটের সিদ্ধান্তের ওপর।

উম্মাহ কণ্ঠ

Side banner

সংবাদ বিভাগের আরো খবর

banner
Link copied!